বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.) নওগাঁয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে শহিদ ড. জোহা দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেন ড. সৈয়দ মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক।
দিবসটি উপলক্ষে একুশে পরিষদ নওগাঁর উদ্যোগে শহরের
ঐতিহ্যবাহী প্যারীমোহন সাধারণ গ্রন্থাগার মিলনায়তনে বিকেল সাড়ে চারটায় এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিকের সভাপতিত্বে সভার শুরুতেই শহিদ ড. জোহার আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভায় বক্তব্য রাখেন একুশে পরিষদের উপদেষ্টা আব্দুল ছাত্তার মণ্ডল ও প্রকৌশলী গুরুদাস দত্ত, সভাপতি অ্যাডভোকেট ডি. এম. আব্দুল বারী, প্রদ্যুৎ ফৌজদার, সহ-সভাপতি প্রতাপ চন্দ্র সরকার, সাধারণ সম্পাদক এম. এম. রাসেল, সহ-সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা আল হোসাইন তারিক, নাইস পারভীন, শাকিরুল ইসলাম রাসেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর আব্দুল বারিক সাচ্চু, সুবল চন্দ্র মণ্ডল, সেলিনা বানু মুক্তা ও শফিউল ইসলাম রাফিনসহ আরও অনেকে।
১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণার দাবি
বক্তারা ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণার জোর দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, ড. জোহার আত্মত্যাগ সামরিক শাসক আইয়ুব খান-এর শাসনব্যবস্থার পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর চলমান ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। ড. জোহা হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের মানুষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে।
বক্তারা আরও বলেন, ড. জোহা ছিলেন দেশের প্রথম শহিদ বুদ্ধিজীবী, যাঁকে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। একুশে পরিষদ নওগাঁ ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করে আসছে।
ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়
উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও উত্তাল হয়ে ওঠে। ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে প্রধান ফটকের সামনে পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালানোর প্রস্তুতি নেয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন—
“Don’t fire, I said don’t fire! কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার বুকে গুলি লাগে।”
কিন্তু সেনারা তাঁর আহ্বানে কর্ণপাত করেনি। সকাল প্রায় ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন হাদী পিস্তল বের করে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল অফিসে নিয়ে গিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর এই আত্মদান বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে এক অমোচনীয় ইতিহাস হয়ে আছে।