শেরপুর জেলা কৃষি প্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে এখানকার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, ফলের বাগান, নদী-খাল ও বৈচিত্র্যময় কৃষিকাজ পর্যটনের জন্যও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর আনন্দ ও কৃষির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে কৃষি পর্যটন। শহরের ব্যস্ততা ও কৃত্রিম জীবনের বাইরে এসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, কৃষকের জীবনযাত্রা দেখা ও কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ দেশের পর্যটকদের জন্য হতে পারে এক ব্যতিক্রমী আকর্ষণ। শহরের পরিবেশে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু-কিশোর জানে না ধান কীভাবে হয়, কীভাবে কৃষক পরিশ্রম করে ফসল ফলায়। তারা শুধু টিভিতে এসব দেখে, কিন্তু বাস্তবে অনুভব করতে পারে না। কৃষি পর্যটন এমনই এক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র যেখানে শহরের তরুণ-তরুণীরা গ্রামে এসে কৃষির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। ধানের ক্ষেত, সরিষার খেত, ফলের বাগান কিংবা সবজির খামার দেখে তারা যেমন আনন্দ পাবে, তেমনি শিখতেও পারবে কৃষির নানা দিক। শীতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটার অভিজ্ঞতা কিংবা কৃষকের সঙ্গে মাঠে কাজ করার আনন্দ শহরের নাগরিক জীবনে পাওয়া সম্ভব নয়। এভাবে কৃষি পর্যটন শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। শেরপুরের প্রকৃতি কৃষি পর্যটনের জন্য আদর্শ। এ জেলার মাঠজুড়ে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসলের সমারোহ থাকে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে চরাঞ্চল এবং নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ও উরফা ইউনিয়নে সরিষার ব্যাপক চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সরিষার ফুল ফোটার সময় দিগন্তজুড়ে হলুদ রঙের এক মোহময় দৃশ্য তৈরি হয়। এমন দৃশ্য দেখতে শহরের মানুষ ছুটে এলে তা হবে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সরিষার ক্ষেতে মৌমাছি পালন, সরাসরি মধু সংগ্রহ করা এবং তা পর্যটকদের জন্য বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে এটি কৃষকদের জন্যও লাভজনক হতে পারে। এছাড়া শেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে আম, লিচু, কলা, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলের বাগান। এসব বাগানে গিয়ে সরাসরি ফল সংগ্রহ করে খাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। পাশাপাশি ওষুধি ও বনজ গাছের নার্সারি, অর্কিড বাগান এবং সবজির ক্ষেত পরিদর্শন করাও হতে পারে বাড়তি আনন্দের বিষয়। টাটকা সবজি সংগ্রহ, বিভিন্ন ফুলগাছ দেখা এবং কৃষকদের কাছ থেকে চাষাবাদের কৌশল শেখার সুযোগ পর্যটকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে পারে। শেরপুরে একসময় ২০টিরও বেশি খাল, অর্ধশতাধিক বিল ও ৭টি নদী ছিল। এসব জলাশয় কৃষি পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। নৌকা করে ঘুরে বেড়ানো, মাছ ধরা ও পাখি দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য নতুন মাত্রা যোগ করবে। নৌকা বাইচ দেখা এবং নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের জন্য উপভোগ্য হতে পারে। শেরপুরে কৃষি ভিত্তিক অনেক মিল-ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। এখানে অটোমেটিক রাইস মিল, হিমাগার, মুড়ি ও চিড়া তৈরির কারখানা, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় পর্যটকদের জন্য পরিদর্শনের সুযোগ তৈরি করা হলে তারা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবে, যা শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা হতে পারে। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় বসবাসরত গারো ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতি পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। তাদের কৃষিকাজের ধরন, উৎসব-পার্বণ, খাবার ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা পর্যটকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেবে। গারোদের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি, তাদের কৃষিকাজের পদ্ধতি এবং জীবনধারা পর্যটকদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করতে পারে। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন,এখানকার গারো পাহাড়ি উপজাতীয়দের সাথে পরিচিত হওয়া, তাদের কৃষ্টিকালচার সমন্ধে ধারণা অর্জন। কৃষকের কর্মকান্ড পরিদর্শন ও কৃষকের মুখ থেকে শোনা ফসল উৎপাদ ও জীবীকা নির্বাহের বর্ণনা ইত্যাদি কৃষি পর্যটনে আকর্ষণ বাড়তে সহায়ক হতে পারে।’ শেরপুরের কৃষি পর্যটনকে আরও উন্নত করতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে তা শুধু পর্যটন শিল্পের বিকাশেই সাহায্য করবে না, বরং কৃষকদের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শেরপুরের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এটি দেশের পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং কৃষি অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।