সারা দেশ যখন স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে, তখন সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় প্রস্তুত একদল মানুষ। পশ্চিম সুন্দরবনের বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য এবার ঈদ মানে আনন্দ নয়, বরং বনের সম্পদ রক্ষায় কঠোর ডিউটি। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে আগামী ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সকল বনকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ফলে পরিবার ছাড়াই বাঘ-বনবিবির ডেরায় নির্জনে কাটবে তাদের এবারের ঈদ। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা—এই দুই রেঞ্জের অধীনে ৯টি স্টেশন ও ৩০টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। সাধারণত ঈদের লম্বা ছুটিতে চোরা শিকারি ও কাঠ পাচারকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সেই ঝুঁকি এড়াতে এবার বিশেষ ‘নিরাপত্তা বলয়’ তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বনের ভেতর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দুর্গম এলাকায় পায়ে হেঁটে তল্লাশি চালাবেন বনপ্রহরীরা। দ্রুতগামী স্পিডবোট, ফাইবার বোট এবং কাঠের ট্রলার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে পশ্চিম বিভাগে জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। যেখানে অন্তত ৫ শতাধিক কর্মীর প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ৩০০ জন কর্মী দিয়ে চলছে বিশাল এই বনের দেখভাল। এই স্বল্প জনবল নিয়েই বনজ সম্পদ রক্ষায় রাতদিন এক করছেন তারা। খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, “ঈদ সামনে রেখে আমরা জরুরি সভার মাধ্যমে সব ফাঁড়ি ও স্টেশনকে সতর্ক করেছি। দুর্বৃত্তরা যাতে কোনো সুযোগ না পায়, সেজন্য টহল জোরদার করা হয়েছে।”সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাবেন, আর আমাদের কর্মীরা বনের গহীনে নির্জনে পরিবারহীন ঈদ করবেন কেবল প্রকৃতির মায়ায়।”
— এজেডএম হাছানুর রহমান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (পশ্চিম সুন্দরবন)। বনের নির্জনতা আর বন্যপ্রাণীর আক্রমণের ভয় যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করি। ২০১৭ সালে নামমাত্র ঝুঁকিভাতা চালু হলেও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবি আজও পূরণ হয়নি। আমাদের দিকে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।” সব সীমাবদ্ধতা আর প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট বুকে চেপে, সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরীরা প্রস্তুত। তাদের ত্যাগেই হয়তো এবারের ঈদেও নিরাপদ থাকবে বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন।