১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তথা ৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ ভাষা আন্দোলন কেবল বাঙালির ভাষার জন্য লড়াই ছিল না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অসমতা, সাংবিধানিক অধিকার ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের জন্য প্রথম ঐতিহাসিক আন্দোলন। ইতিহাসকে যদি আমরা বিবেক ও চেতনার দর্পনে দেখি তবে দেখা যায় যে, এটি কেবল আবেগপ্রবণ ছাত্র আন্দোলন বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের খেলা ছিল না। বরং এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রনীতি, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল বাংলা ভাষাভাষী জনগণের জন্য এক রক্তাক্ত, বেদনাবিধূর, দূঃসহ স্মৃতির দিন, যা আজও জাতীয় ইতিহাসের এক অমলিন অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক দ্বীজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২১শে মার্চ ১৯৪৮ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওায়ার্দী উদ্যানে প্রথম ঘোষণা দেন “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু” এবং ২৪শে মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দ্বীতিয়বার ঘোষণা করেন— “Urdu and Urdu alone shall be the state language of Pakistan.” এর অর্থ হল যে, উভয় পাকিস্তানের একক রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি উর্দুকে উভয় প্রদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন এবং এই একপাক্ষিক সিদ্ধান্তকে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্থানের বাংলাভাষী জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যা ছিল রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত। যদিও তিনি বাংলা ভাষাকে সরাসরি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন নাই, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া ছিল এক ধরণের কপট স্বেচ্ছাচারিতা, যা পশ্চিম পাকিস্থানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রত্যাখ্যান করে। “বাংলা” কে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেয়ার এই সিদ্ধান্ত পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল স্বার্থবিরোধী। যার কারণে সচেতন জনগণের মনে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। এর প্রতিক্রিয়ায় সংগঠিত হয় ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে এক বিশাল গণবিক্ষোভ। ভাষা আন্দোলন ছিল ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ। মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন আবদুল মতিন, যিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেন। রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেন ন্যাপ এর মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ -এর ঐতিহাসিক সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছিলেন। সেদিন ছাত্র-জনতার প্রতিবাদী মিছিল যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রেসকোর্স ময়দানের দিকে এগোতে শুরু করে, তখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল জব্বার এবং শফিউর রহমান। তাঁদের আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে সীমিত ছাত্র-আন্দোলন থেকে জাতীয় দাবিতে রূপান্তরিত করে। ভাষা আন্দোলনের মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম ও দাবি আদায়ের স্বপক্ষে গণজাগরণ। পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও সরকারী চাকুরি, সেনাবাহিনী এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উর্দু একক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ব পাকিস্থানের জনগণের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। এটি কেবল সাংস্কৃতিক বা আবেগঘন লড়াই ছিল না বরং ছিল রাজনৈতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার এবং সাংবিধানিক মর্যাদার দাবির সংগ্রাম। আজও কিছু কথিত সুশীল মহল আন্দোলনের ইতিহাসকে কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে। তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে বিভেদ সৃষ্টি করে, অথচ বাস্তব ইতিহাসে দেখা যায়, এই আন্দোলন ছিল সর্বদলীয় রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে একটি গণতান্ত্রিক দাবি উপস্থাপন আন্দোলন। মওলানা ভাসানী, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ ছাত্র ও নেতা এই লড়াইয়ে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু উভয়কেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের এই সাফল্য প্রমাণ করে, এটি ছিল শুধুমাত্র আবেগ, ভুল বোঝাবুঝি বা ষড়যন্ত্রের ফল নয়। বরং এটি ছিল ভাষা, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য জনগণের সম্মিলিত সংগ্রাম। শহীদদের রক্ত, ছাত্রনেতা ও ভাষা সৈনিকদের সাহসিকতা এবং সাধারণ জনগণের লড়াই আজও আমাদের শেখায় রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং মর্যাদা সংরক্ষিত থাকে। ৫২-র ভাষা আন্দোলনকে কেবল একটি আবেগপ্রবণ সাংস্কৃতিক জাগরণ হিসেবে দেখা হবে ইতিহাসের খণ্ডিত পাঠ। বর্তমানে একদল ‘সুশীল’ বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই আন্দোলনকে শুধুমাত্র গান, কবিতা এবং পুষ্পস্তবকের ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চায়। তাদের এই ‘স্ট্যান্টবাজি’ ও তথ্যের বিকৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় আন্দোলনের সেই রূঢ় বাস্তব ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্বের সাথে মিশে ছিল। চেতনার দোহাই দিয়ে আজ যে বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করার এক সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা।