দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর বর্তমানে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এই বন্দরের কার্যক্রমে এসেছে উল্লেখযোগ্য গতি। ফলে দিন দিন বাড়ছে জাহাজ আগমন, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কনটেইনার পরিবহনে নতুন রেকর্ড গড়েছে মোংলা বন্দর, যা দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর দিয়ে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কনটেইনার পরিবহনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যবহারকারীবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত সাত মাসে মোংলা বন্দর দিয়ে রেকর্ড পরিমাণ কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। অর্থবছরের (২০২৫–২৬) সাত মাসে ৩১টি বিদেশি বাণিজ্যিক কনটেইনারবাহী জাহাজ এসেছে এবং গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২১ হাজার ৬৫১ টিইইউস কনটেইনার লোড-আনলোড হয়েছে, যা গেল অর্থবছরের তুলনায় ৭৯ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে মোট ২১ হাজার ৪৫৬ টিইইউস কনটেইনার পরিবহন হয়েছিল, অথচ চলতি অর্থবছরের মাত্র সাত মাসেই সেই পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাকরুজ্জামান এসব তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই–২০২৫ থেকে জানুয়ারি–২০২৬ এই সাত মাসে ৫১৫টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এসেছে। এ সময়ে ছয় হাজার ৪০৪টি রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়েছে। কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ৮২ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক তিন শতাংশ বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫–২৬ অর্থবছরের এখনও পাঁচ মাস বাকি। এই সাত মাসেই আমরা গত বছরের রেকর্ড পার করে নতুন রেকর্ড তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করা যাচ্ছে, অর্থবছর শেষে মোংলা বন্দর কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, বন্দর ব্যবহারকারীদের সুবিধার্থে হিরণ পয়েন্ট এলাকায় তিনটি নতুন অপারেশনাল অ্যাঙ্কর বার্থ ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এসব বার্থে ৯.০০ মিটার ড্রাফটের ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এখন থেকে ওই বার্থসমূহে সর্বোচ্চ ২০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ মিটার ড্রাফটের বাণিজ্যিক জাহাজ সহজেই অপারেশন করা সম্ভব হবে। এতে বন্দরের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বড় জাহাজ আগমন সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বর্তমানে মোংলা বন্দর দিয়ে খাদ্যশস্য, সিমেন্টের কাঁচামাল, ক্লিংকার, সার, অটোমোবাইল, যন্ত্রপাতি, চাল, গম, কয়লা, তেল, পাথর, ভুট্টা, বীজ এবং এলপিজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হয়। অন্যদিকে এই বন্দর ব্যবহার করে দেশের সাদা মাছ, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, কাঁকড়া, মাটির টাইলস, রেশম কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ রাজধানীর যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ফলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের আগ্রহও বাড়ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, নতুন জেটি নির্মাণ এবং নাব্যতা উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় মোংলা বন্দর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে মোংলা বন্দর এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয় ও কার্যকর। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে বন্দরের অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।