ডিমলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গেটেই অবৈধ ‘ইসলাম ডায়াগনস্টিক’, অনুমোদন দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা

হাসপাতালের গেট পার হতেই চোখে পড়ে চকচকে বহুতল ভবন। সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ইসলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ অনিয়ম ও সরকারি স্বাস্থ্যনীতি লঙ্ঘনের চিত্র। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক প্রবেশপথেই কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবার নামে ব্যবসা খুলে বসেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো বৈধ লাইসেন্স না থাকলেও এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার ‘মৌখিক অনুমোদনে’ চলছে এর কার্যক্রম, যা দেশের প্রচলিত স্বাস্থ্য আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও অপরাধ।

সরেজমিনে জানা যায়, গত ১১ সেপ্টেম্বর জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ‘ইসলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’র উদ্বোধন করা হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) কোনো নিয়মকানুন বা শর্ত তারা পূরণ করেনি।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মমিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বেআইনি কার্যক্রমের কথা কার্যত স্বীকার করে নেন। সরকারি অনুমোদন না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন; উল্টো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দেন।

অনুমোদনের বিষয়ে মমিনুর রহমান দাবি করেন, “প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন দিতে হচ্ছে, তাই তিনি উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার শরণাপন্ন হয়েছেন এবং ওই শীর্ষ নেতাই তাকে সেন্টারটি পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছেন!”

একজন ব্যবসায়ীর মুখে এমন বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয় কীভাবে প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকিকে তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে রোগীদের পকেট কাটার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একদম প্রবেশদ্বারে এমন অবৈধ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সাধারণ চিকিৎসাপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, সরকারি হাসপাতালে আসা অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এবং দালালের খপ্পরে ফেলে এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে চিকিৎসার ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি ভুল ও অপেশাদার পরীক্ষার রিপোর্টে রোগীর জীবনও চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, “উদ্বোধন আর বৈধতার বিষয়টি এক নয়। স্বাস্থ্য দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান চালুর কোনো সুযোগ নেই। ডিমলা উপজেলায় ‘ইসলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।”

বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। নীলফামারীর সিভিল সার্জন ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক আইনি কঠোরতার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বৈধ লাইসেন্স বা ডিজিএইচএস-এর অনুমোদন ছাড়া ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানোর কোনো সুযোগ নেই। রোগীর নিরাপত্তা ও সঠিক সেবা নিশ্চিত করা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সরকারি হাসপাতালের গেটে সক্রিয় দালাল চক্রের অপতৎপরতা বন্ধে অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ ‘ইসলাম ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ সিলগালা করার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top