রাষ্ট্রীয় আইন, সংবিধান ও নৈতিকতার প্রশ্নে দাঁড়িয়ে সোনাগাজী উপজেলার কিছু নুরানী মাদরাসার কার্যক্রম এখন গুরুতর বিতর্কের মুখে। অভিযোগ উঠেছে—নুরানী তালিমুল কোরআন বোর্ডের আওতাভুক্ত দাবি করা একাধিক মাদরাসায় রাষ্ট্র ঘোষিত ছুটি, বোর্ডের নির্দেশনা এবং শিক্ষকদের মৌলিক শ্রম অধিকার নিয়মিতভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অনিয়মগুলো ঘটছে বোর্ডের নীরবতা ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে।
নির্বাচন উপলক্ষে ছুটি—বোর্ড মানলেও মানছে না কিছু মাদরাসা
নুরানী তালিমুল কোরআন বোর্ড জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে গত মঙ্গলবার থেকে দেশের আওতাধীন নুরানী মাদরাসাগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।
কিন্তু ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার কয়েকটি মাদরাসায় বুধবারও নিয়মিত ক্লাস চালু রাখা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একাধিক শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন—
“বোর্ডের ঘোষণা দেখিয়েও লাভ হয়নি। আমাদের বলা হয়েছে—‘বোর্ড দেখায় খাওয়াবে?’”
প্রশ্ন উঠছে—বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করার এখতিয়ার মোহতামিমরা কোথা থেকে পাচ্ছেন?
সংবিধান বনাম মোহতামিমের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদে শ্রমের মর্যাদা এবং ২৩ অনুচ্ছেদে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এর বাইরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার সুযোগ নেই—তা দ্বীনি হোক বা আধুনিক।
তবু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু নুরানী মাদরাসায় মোহতামিমের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত আইন।
একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর—কোনো দিনই ছুটি নেই। বললে বলা হয়, ‘সরকার তো বেতন দেয় না, তাই সরকারি ছুটিও মানতে হবে না।’”
আইনবিদদের প্রশ্ন— বেতন ব্যক্তিগতভাবে দিলেই কি রাষ্ট্রীয় আইন অকার্যকর হয়ে যায়?
‘দ্বীনের খেদমত’ বনাম শ্রমিক অধিকার
শিক্ষকরা বলছেন, তারা পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করেন—ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষা, অভিভাবক বৈঠক, অতিরিক্ত সময় দেওয়া—সবই নিয়মিত।
একজন শিক্ষকের কণ্ঠে ক্ষোভ—
“আমরা দ্বীনের খেদমত করি। কিন্তু দ্বীনের নামে যদি আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা জুলুম ছাড়া আর কী?”
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে,
ইসলাম শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলে—অমানবিক আচরণ বা জবরদস্তি কখনোই দ্বীনের শিক্ষা নয়।
বোর্ড কি শুধু নামেই বোর্ড?
নুরানী তালিমুল কোরআন বোর্ড একটি বেসরকারি শিক্ষা বোর্ড হিসেবে পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও শিক্ষক নির্যাতন বা নিয়ম ভাঙার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই সীমিত।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—
বোর্ড কি অভিযোগ গ্রহণ করে?
কোনো তদন্ত কমিটি আছে?
কোনো মাদরাসার বিরুদ্ধে কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট কোনো জবাব এখনো দৃশ্যমান নয়।
সচেতন মহলের সুপারিশ
শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন—
প্রতিটি নুরানী মাদরাসায় লিখিত পরিচালনা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে
রাষ্ট্রীয় ছুটি ও সাপ্তাহিক বিশ্রাম নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন
বোর্ডের অধীনে স্বাধীন শিক্ষক অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল গঠন জরুরি
আইন লঙ্ঘনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে
উপসংহার
দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানেই আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে—এই ধারণা শুধু ভুল নয়, সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
নুরানী মাদরাসা সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—তবে সেই ভূমিকা টেকসই হবে ন্যায়, মানবিকতা ও আইনের শাসনের ভিতের ওপর দাঁড়ালে।
এখন প্রশ্ন একটাই—
রাষ্ট্র, বোর্ড ও সমাজ—কে আগে দায়িত্ব নেবে?