বিশেষ বিশ্লেষণ,দৈনিক দেশ বুলেটিন – ঢাকা,
জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। যখন একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কথা, ঠিক তখনই তথ্যপ্রবাহের ওপর এক ‘অদৃশ্য দেয়াল’ তুলে দিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভেতরে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রধান বাহনটিকে অকেজো করে দিয়ে ইসি আসলে কী লুকাতে চাইছে—সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে জোরালো হয়ে উঠেছে। তথ্য-অন্ধকারের নীল নকশা? নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, মোবাইল ফোন এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তাৎক্ষণিক অনিয়ম ধরার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বিগত নির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট কিংবা বুথের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের দৃশ্যগুলো সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের মোবাইল ক্যামেরা দিয়েই বিশ্ববাসী দেখেছে। এবার সেই মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার অর্থ হলো—ভোটকেন্দ্রে কোনো অনিয়ম ঘটলেও তার কোনো তাৎক্ষণিক ভিডিও বা ডিজিটাল প্রমাণ বাইরে আসতে পারবে না। তবে কি কোনো বড় ধরনের কারচুপির ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এই ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’? জনগণের চোখ বনাম সরকারি ক্যামেরা ইসি দাবি করছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পুলিশের শরীরে ‘বডি ওর্ন’ ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? সেই ভিডিও কেবল কমিশনই দেখবে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। অথচ সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ছিল সাধারণ জনগণের ‘তৃতীয় চোখ’। সেই স্বাধীন চোখকে অন্ধ করে দিয়ে কেবল সরকারি নিয়ন্ত্রিত ক্যামেরার ওপর ভরসা করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। কেন এই গোপনীয়তার আয়োজন? নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল প্রিসাইডিং অফিসার ও নির্দিষ্ট কয়েকজন নিরাপত্তা সদস্য ফোন রাখতে পারবেন। এর অর্থ হলো, ভোটকেন্দ্রের ভেতরের পরিস্থিতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রশাসনের হাতে। যদি ভোটদান প্রক্রিয়া স্বচ্ছই হয়, তবে ছবি তোলা বা ভিডিও করাতে ভয় কোথায়? সত্যকে যদি লুকানোর চেষ্টা না থাকে, তবে জনগণের এই আধুনিক হাতিয়ার কেড়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেন পড়ল—তা নিয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ইসি। সাংবাদিকদের ওপর আস্থার অভাব ইতোমধ্যেই দেশের ১৩৬ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এই নির্বাচনকে অসাংবিধানিক ও প্রহসনমূলক আখ্যা দিয়ে বর্জনের ডাক দিয়েছেন। এমন সময়ে সাংবাদিকদের গতিবিধি সীমিত করা এবং মোবাইল কেড়ে নেওয়া যেন আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। সাংবাদিক মহলের মতে, “মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া মানে হলো সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরা। এর মাধ্যমে ইসি প্রমাণ করল, তারা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ভয় পায়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো অবাধ তথ্যপ্রবাহ। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের আগে তথ্যকে কুক্ষিগত করার যে প্রয়াস ইসি চালাচ্ছে, তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। কোনো ভয় বা কোনো সত্যকে আড়াল করতে এই কঠোর বিধিনিষেধ—তা ৩ দিন পরই প্রমাণিত হবে। তবে জনগণের আস্থা হারিয়ে এবং তথ্যকে রুদ্ধ করে দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা যে অসম্ভব, ইসি সম্ভবত সেই ধ্রুব সত্যটি ভুলে গেছে।