মাজে নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস কিংবা পুরুষ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা হয় বটে কিন্তু বাস্তবতা হলো যেদিন নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার নিশ্চিত হবে, সেদিন এসব দিবসের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবে। সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী ও পুরুষের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক সমাজে নারী এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হন। ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা সামাজিক নিপীড়নের মতো ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এসব ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হলো, সমাজে যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন ভুক্তভোগী নারী সঠিক ও দ্রুত বিচার পান না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং সমাজে সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে। তবে আরেকটি দিকও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সমাজে এমন ঘটনাও ঘটে যেখানে পুরুষরাও পারিবারিক সহিংসতা, নারী কর্তৃক পুরুষাঙ্গ কর্তন, হামলা, মানসিক নিপীড়ন কিংবা সামাজিক অপমানের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু সামাজিক ধারণা ও প্রচলিত কাঠামোর কারণে এসব ঘটনা অনেক সময় প্রকাশ পায় না কিংবা প্রকাশ পেলেও সঠিকভাবে গুরুত্ব পায় না। ফলে তারাও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে সমাজে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এমন এক সমাজ, যে সমাজে নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার সমানভাবে স্বীকৃত ও সুরক্ষিত থাকবে। আইন ও বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন যাতে কোনো ব্যক্তি তিনি নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন? নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার পাবেন।
নারীদের সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন একমাত্র সমাধান নয়; দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন একটি ন্যায়ভিত্তিক আইনি কাঠামো। যেখানে সবার জন্য সমানভাবে বিচার নিশ্চিত হবে। একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ আইনই নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকারকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে পারে। এছাড়া সামাজিক সহিংসতার পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা পরকীয়ার মতো বিষয়গুলোও অনেক সময় ভূমিকা রাখে। এসব কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন দেখা যায় এবং কখনো কখনো তা সহিংসতার রূপ নেয়। তাই আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহনশীলতার চর্চা।
বর্তমান সমাজে এই সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের অভাবই সমাজ নানা সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী ও পুরুষের উভয়ের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক সামাজিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। তাহলে সমাজ তখনি উন্নত ও মানবিক হয়ে উঠবে, যখন নারী বা পুরুষ কোনো পরিচয় কারও জন্য বৈষম্যের কারণ হবে না। বরং সবাই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাবেন। তখনি নারী দিবস বা পুরুষ দিবস একটি সমতাভিত্তিক সমাজের প্রতীক হয়ে উঠবে।