ঢাকার যানজট এড়িয়ে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার লক্ষ্যে নির্মিত ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে এখনো প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ চালু থাকলেও পুরো প্রকল্প এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই নির্ধারিত হারে টোল আদায় করায় অনেক যানবাহন চালক এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (DBEDCL) মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) প্রকল্প, যেখানে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ (SRBG) এবং বাংলাদেশের শামীম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (SEL) ও ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করছে।
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। বর্তমানে প্রায় ১৮ কিলোমিটার অংশ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। এটি বাংলাদেশের প্রথম সম্পূর্ণ ঘেরা (fully enclosed) এক্সপ্রেসওয়ে। এই সড়কটি দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়ক—ঢাকা–চট্টগ্রাম (N1), ঢাকা–সিলেট (N2), ঢাকা–ময়মনসিংহ (N3) এবং ঢাকা–টাঙ্গাইল (N4)—এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ না করেই উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত সম্ভব হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হচ্ছে ১২টি সেতু, ৭টি ফ্লাইওভার, ২৭টি আন্ডারপাস এবং ৫টি টোল প্লাজা।
দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা থাকলেও আগ্রহ কম
যানবাহন চালকরা জানান, এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করলে অল্প সময়ের মধ্যেই গাজীপুর বাইপাস থেকে কাঞ্চন ব্রিজ কিংবা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পৌঁছানো যায়। বিশেষ করে মিরের বাজার হয়ে এই রুটে যাতায়াত করলে সময় ও জ্বালানি উভয়ই সাশ্রয় হয়। তবে পুরো সড়ক ও সব সংযোগ এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় অনেক স্থানে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।
চালকদের অভিযোগ, অসম্পূর্ণ সড়কে পূর্ণ টোল আদায় করা হলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের আগ্রহ কমে যায়। ফলে অনেকেই বিকল্প ফ্রি সড়ক ব্যবহার করছেন।
টোল হার (সম্পূর্ণ দূরত্ব অনুযায়ী)
নিচে যানবাহনভেদে নির্ধারিত টোল হার তুলে ধরা হলো:
আংশিক অংশে টোল (টাকা)
যানবাহনের ধরন
সম্পূর্ণ দূরত্বে টোল (টাকা)
বড় ট্রাক (৩ বা ততোধিক অ্যাক্সেল, ১৫–২৫ টন)
১,৬০০
৭৪০
ভারী ট্রাক (২–৩ অ্যাক্সেল, ৭ টনের বেশি)
১,২৮০
৬১০
মাঝারি ট্রাক (৫–৭ টন)
৮০০
৪০০
বড় বাস (৩১ আসন)
৬০০
৩১০
ছোট ট্রাক (৩ টন)
৪৮০
২৬০
মিনিবাস / কোস্টার
৩৬০
২১০
মাইক্রোবাস
৩২০
১৯০
পিকআপ / জিপ / রেকার
২৮০
১৮০
সেডান কার
২০০
১৫০
বিশেষজ্ঞদের মতামত
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা, সংযোগ সড়ক ও প্রবেশ–বহির্গমন পয়েন্টগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা এবং আংশিক চালু অবস্থায় টোল হার পুনর্বিবেচনা করা হলে এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে, ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় প্রকল্প হলেও অসম্পূর্ণ অবকাঠামো এবং পূর্ণ টোল আদায়ের কারণে এখনো সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। কাজ শেষ হলে এবং সেবার মান নিশ্চিত হলে এই এক্সপ্রেসওয়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।