এক বাবার অনুপস্থিতিতে জন্ম, অনুপস্থিতিতেই বিদায়। কবর জিয়ারত শেষে সাদ্দাম বলেন, “স্ত্রী–সন্তানের লাশের বিনিময়ে আমাকে জামিন দেওয়া হলো”
বাগেরহাটের জুয়েল হাসান সাদ্দামের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং আমাদের সামষ্টিক বিবেকের সামনে দাঁড় করানো এক নির্মম প্রশ্ন। এক বাবার অনুপস্থিতিতে সন্তানের জন্ম, আর সেই বাবার অনুপস্থিতিতেই মা ও শিশুর বিদায়—এই বাস্তবতা কোনো সাহিত্যিক কল্পনা নয়, এটি আজকের বাংলাদেশের এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গ্রেপ্তার হওয়া সাদ্দামের স্ত্রী ও সদ্যজাত সন্তান দীর্ঘ নয় মাস ন্যূনতম মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। একাধিকবার কারাগারের গেটে গিয়ে শিশুটিকে বাবার কোলে দেওয়ার আকুতি জানানো হয়। প্রতিবারই ‘শো অ্যারেস্ট’-এর অজুহাতে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এটি আইনের কঠোর প্রয়োগ নয়, বরং অমানবিকতার নগ্ন প্রকাশ।
চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি আসে তখন, যখন দীর্ঘ অবহেলা, মানসিক যন্ত্রণা ও অসহায়ত্বে এক মা আত্মহননের পথ বেছে নেন—সঙ্গে নিষ্পাপ শিশুটিও চলে যায় মৃত্যুর কোলে। সেই খবর পাওয়ার পরও সাদ্দামকে স্ত্রীর ও সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোল দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কীভাবে হুমকির মুখে পড়ত? কবর জিয়ারত শেষে ভেঙে পড়া কণ্ঠে সাদ্দামের উচ্চারণ— “স্ত্রী–সন্তানের লাশের বিনিময়ে আমাকে জামিন দেওয়া হলো”— এই একটি বাক্যই যেন পুরো ঘটনার সারসংক্ষেপ।
আইনের শাসন মানে কেবল শাস্তি নয়; এর সঙ্গে মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্য থাকা জরুরি। একজন মানুষ অপরাধী হলেও তিনি বাবা, স্বামী এবং সন্তানহারা এক শোকাহত মানুষ। জানাজায় দাঁড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তারা ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু এই ঘটনায় সেই ইনসাফ কোথায় ছিল? শত্রুর সাথেও ন্যায়বিচারের যে শিক্ষা ধর্ম, সংবিধান ও মানবতা দেয়—তার কোনো প্রতিফলন এখানে দেখা যায়নি।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যখন ক্ষমতা ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে, আর মানুষের ভাষা শোনে না—তখন ট্র্যাজেডি অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইতিহাস এমন নিষ্ঠুরতা ভুলে যায় না। আজ না হোক, একদিন এই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে।