নতুন সেতু দাঁড়িয়ে, মৃত্যু ঝুঁকিতে প্রতিদিন পারাপার—গাফিলতি ঈশ্বরগঞ্জ-এর নিত্যসঙ্গী
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ৯নং এলজিইডি সড়কের বগাপুতা অংশে প্রায় ২ কিলোমিটার এবং ১০নং এলজিইডি সড়কের ছয়টি মৌজার ভূমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় স্থানীয়দের বাধার মুখে গত চার বছর ধরে রাস্তা ও সেতুর সংযোগ সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জানা গেছে, ঈশ্বরগঞ্জ–আঠারবাড়ী আঞ্চলিক সড়কের বগাপুতা খালের ওপর প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১ দশমিক ৮২৮ মিটার দীর্ঘ একটি অত্যাধুনিক সেতু নির্মাণ করা হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেটি আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। চার বছর ধরে অচল পড়ে থাকা এই সেতু এখন উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং অবহেলা আর জনভোগান্তির নীরব সাক্ষী।
সেতুর চারপাশে বগাপুতা গ্রামের অন্তত ১০টি পরিবারের জমি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন না হওয়ায় জমির মালিকরা এখনো তাদের ন্যায্য মূল্য পাননি। সরেজমিনে কথা হলে জমির মালিক মজিবুর রহমান, আব্দুস ছাত্তার, আব্দুল লতিফ ও আব্দুর রাশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে বছরের পর বছর আমাদের জমির টাকা আটকে আছে। টাকা না পেলে সংযোগ সড়ক করতে দেওয়া হবে না।”
নতুন সেতুটি চালু না হওয়ায় পাশের একটি জরাজীর্ণ ও সরু পুরাতন সেতুর ওপর দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার হালকা ও ভারী যানবাহন চলাচল করছে। এতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
ঈশ্বরগঞ্জ পরিবহন শ্রমিক সমিতির সভাপতি বাবুল মিয়া জানান, “এই আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে কেন্দুয়া ও আঠারবাড়ী রোড হয়ে ঢাকাগামী দূরপাল্লার বাসগুলো প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে। বিকল্প কোনো নিরাপদ পথ না থাকায় আমরা বাধ্য হচ্ছি এই বিপজ্জনক সেতু ব্যবহার করতে।”
ঈশ্বরগঞ্জ রেন্ট-এ কার ক্লাবের কার্যকরী সভাপতি মফিজ উদ্দিন বলেন, “নতুন সেতু থাকলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় আমাদের পুরাতন সরু সেতু দিয়েই পার হতে হয়। এতে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। ঈশ্বরগঞ্জ থেকে বগাপুতা পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তার এমন বেহাল অবস্থা যে, জীবিকার তাগিদ না থাকলে কেউ এই পথে গাড়ি চালাতে চাইবে না।” তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী ট্রাক ঈশ্বরগঞ্জ ও রায়বাজারে পৌঁছানোর একমাত্র সড়ক পথ এটি।
ট্রাকচালক আব্দুল গফুর জানান, “পণ্য বোঝাই ট্রাক নিয়ে পুরাতন সেতু পার হতে খুব ভয় লাগে। কখন যে সেতু ভেঙে পড়ে বা দুর্ঘটনা ঘটে যায়—সে আশঙ্কা নিয়েই আমাদের চলতে হয়।”
এদিকে গ্রামীণ এই ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধসমাপ্ত কংক্রিট সেতুটি এলাকাবাসীর জন্য নীরব আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, এক পাশে মাটির রাস্তা দিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল, অন্য পাশে অসম্পূর্ণ সেতুর বিশাল কাঠামো খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। সেতুর নিচে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী কিংবা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে গেলে ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান, সেতুর পাশের জমির মালিকদের ৭ ধারার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রাক্কলন তৈরি করে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রায় ৩৭ কোটি টাকা চেয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই ৮ ধারা সম্পন্ন করে দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন—কত প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে এই বরাদ্দের জন্য? দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন ও অন্তত অস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যে কোনো সময় এই সড়ক ও সেতু হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মরণফাঁদ।