একসময় সুরের ঝংকারে মাতিয়ে রাখতেন লাখো মানুষের হৃদয়, তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের আকুলতায় দেশের প্রতিটি প্রান্তের মঞ্চ যেন প্রাণ ফিরে পেত। গান, সুর আর নিজস্ব পরিবেশনশৈলী দিয়ে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া সেই চেনা মানুষটিই লোকসংগীতের প্রতিভাবান বাউলশিল্পী কুদ্দুস বয়াতি। জীবনের দীর্ঘ, আঁকাবাঁকা পথচলায় সংগীতের মাধ্যমে যিনি কুড়িয়েছেন বিশ্বজোড়া পরিচিতি ও বিপুল খ্যাতি, সেই মানুষটির জীবনজুড়ে এখন শুধুই গভীর এক নির্জনতা আর জমতে থাকা অভিমানের পাহাড়।
দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় লোকশিল্পের ধারক হিসেবে তিনি যেমন মানুষের অপার ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি মুখোমুখি হয়েছেন জীবনের অজস্র নির্মম বাস্তবতার। সরলতা ও স্পষ্টভাষিতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির মানুষ তাঁর বিশ্বাস ভেঙেছেন, ঠকিয়েছেন স্বার্থের জালে আটকে। অথচ একজন শিল্পী হিসেবে তিনি সবসময় দেশের মাটি ও শেকড়ের গানের সঙ্গেই বিশ্বস্ত থেকেছেন।
সময় ও স্রোতের টানে তাঁর চারপাশের বাস্তবতা আজ অনেকটাই বদলে গেছে। বিভিন্ন সময় তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে নানা রাজনৈতিক তকমা। তবে এই সব বিতর্কের মুখে বাউল কুদ্দুস বয়াতির বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুদৃঢ়—তিনি কখনোই কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বা দলের ছায়াতলে নিজেকে সঁপে দেননি। একজন পেশাদার ও নিষ্ঠাবান সংগীতসাধক হিসেবে যখন যেখানে ডাক পেয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে সুরের বার্তা পৌঁছে দিতে সেই মঞ্চেই দাঁড়িয়েছেন। তিনি বারেবারে স্মরণ করিয়ে দেন, হাজার বিতর্কের ভিড়েও তাঁর পরিচয় কেবল একটাই—তিনি বাংলার একজন সহজ-সরল বাউলশিল্পী।
দুর্ভাগ্যবশত, ভিত্তিহীন রাজনৈতিক তকমা ও নানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক তাঁর শিল্পচর্চার স্বাভাবিক গতিতে বাধার সৃষ্টি করেছে। সমাজের পরিবর্তন ও চলতি বিতর্কের করাল থাবায় আগের মতো নিয়মিত ব্যস্ততা আজ আর নেই। তার ওপর যোগ হয়েছে একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কিছু মনস্তাত্ত্বিক আক্ষেপ, যা তাঁর কোমল হৃদয়কে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ক্ষোভ, দুঃখ আর অভিমানের বোঝা বইতে না পেরে ঢাকার যান্ত্রিক ও কোলাহলপূর্ণ জীবন পেছনে ফেলে তিনি ফিরে গেছেন নিজের নাড়িপোতা ভিটেয়—নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রাজিবপুর গ্রামে। ইট-কাঠের ইট-পাথরের রাজধানী ছেড়ে গ্রামীণ জীবনের অনাবিল শান্তি আর সাধারণ পরিবেশের মাঝেই আজ তিনি খুঁজে ফিরছেন নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মিক প্রশান্তি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর (২০২৬) বুধবার সন্ধ্যার পর গ্রামীণ গোধূলির নিস্তব্ধতায় তাঁর সঙ্গে আয়োজিত দীর্ঘ আলাপচারিতায় উন্মোচিত হয় এক খ্যাতিমান মানুষের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিষাদময় উপাখ্যান। সেখানে ফুটে ওঠে এক শিল্পীর জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান, ভালোবাসার পাশাপাশি জমা হওয়া পুঞ্জীভূত কষ্ট এবং সমাজের প্রতি নীরব অভিমানের ছায়া। সবকিছুর পরও তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় আবার নিজের ভালোবাসার গানকে সম্বল করে আপন মনে বেঁচে থাকার আকুল বাসনা।
কুদ্দুস বয়াতির মতো একজন আন্তর্জাতিক মানের শেকড়সন্ধানী শিল্পীকে নিয়ে খুব সহজেই নানাজন নানা বিরূপ মন্তব্য করে বসেন। কিন্তু ক্ষণিকের সমালোচনার আগে একবারও অনুধাবন করা হয় না—আজকের এই কুদ্দুস বয়াতি হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে বহু বছরের কঠোর সাধনা, সীমাহীন ত্যাগ এবং দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। লোকসংস্কৃতিতে তাঁর যে অসামান্য অবদান, জীবদ্দশায় আমরা হয়তো তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রাপ্য সম্মান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। প্রতিভার উপযুক্ত স্বীকৃতি না দিয়ে দূরে ঠেলে দেওয়া এক নির্মম ঐতিহাসিক ভুল।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো প্রবাদপ্রতীম শিল্পী হারিয়ে গেলে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি, স্মৃতিচারণ করি। কিন্তু সময় পার হয়ে যাওয়ার পর শোক প্রকাশ করার চেয়ে, একজন জীবন্ত কিংবদন্তিকে তাঁর জীবদ্দশাতেই সম্মান জানানো অনেক বেশি জরুরি। নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী কেন্দুয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই কীর্তিমান বাউল আমাদের লোকসংস্কৃতি ও সংগীতজগতে যে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছেন, তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করতেই হবে। কুদ্দুস বয়াতিকে কেবল একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনের ত্যাগ ও সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। জীবিত অবস্থাতেই যেন এই গুণী শিল্পী তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ও ভালোবাসা নিয়ে হাসিমুখে সুর সাধনায় মগ্ন থাকতে পারেন—আজ সেটাই হোক আমাদের সংস্কৃতিমনস্ক সমাজের সর্বপ্রধান অঙ্গীকার।



