1. admin@desh-bulletin.com : নিজস্ব প্রতিবেদক : দৈনিক প্রতিদিনের অপরাধ
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রকাশ ৩১ আগস্ট পিরোজপুরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপিত খামারকান্দিতে খাল খনন প্রকল্প পরিদর্শনে বগুড়ার জেলা প্রশাসক উপজেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময় সভা এলজিইডি কর্মকর্তাকে মারধর: বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে জিডি ‘গুম নাটকের’ সমন্বয়ক বেল্লালের সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ ফিফা সভাপতি ও রেফারির বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ নিয়ে থানায় নোয়াখালীর তরুণ পাহাড় ধস ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে বাড়ি দেবে সরকার ফেনীতে শহীদ শ্রাবণের কবর জিয়ারত করলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি ইরাকে অতিরিক্ত জনসমাগমে পিছিয়ে গেল খামেনির দাফন

ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ মুঘল-সুলতানী স্থাপত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

Shakhowat Sheikh
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩০২ বার পড়া হয়েছে
উত্থান, বিকাশ এবং পতন বিভিন্ন শাসন আমলের একটি অবধারিত নিয়ম। এই নিয়ম প্রযোজ্য হয় মুঘল ও সুলতানী শাসন আমলের ক্ষেত্রেও। এক সময়ের উজ্জল এ শাসন আমল এক পর্যায়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। এ সকল শাসন আমলে গঠিত বিভন্ন স্থাপত্য সমূহ তৎকালীন  ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেয়। মুঘল ও সুলতানী আমলে মুসলীম প্রাচীন কীতি- সমূহের অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে।
উক্ত শাসন আমলে প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম একটি নিদর্শন হলো “খেরুয়া মসজিদ”। ‘বগুড়া’ জেলার,শেরপুর উপজেলায় আবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপসানলাই নয়, বরং বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে।
বগুড়া জেলা শহর থেকে ২৩ কি:মি দক্ষিনে শেরপুর উপজেলার খন্দোকার টোলা নামক স্থানে  মসজিদটির বর্তমান অবস্থান। শেরপুর শহর থেকে ১-১.৫ কি:মি  দক্ষিণে অবস্থিত।
মসজিদটি তেমন কারুকার্য খচিত না হলেও বেশ স্থূলকায় এবং গঠন গাঁথুনি অতীব দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত। মসজিদটি মুঘল ও সুলতানী আমলের সংমিশ্রনে গঠিত। বাগের হাট ষাট গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ এর সাথে খেরুয়া  মসজিদের হুবুহু সামঞ্জস্য  পরিলক্ষিত হয়।
খেরুয়া মসজিদটির নাম করণ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি।তবে বিভিন্ন ইতিহাস হতে প্রাপ্ত তথ্যের আলেকে বলা যায় যে, জৈনিক ফকির আব্দুস সামাদে উক্ত মসজিদটির নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করেন। মসজিদটির মূল দরজার দু-পাশে দুটি ফার্সি শিলালিপি ছিল যা কিনা কৃষ্ণপাথরের তৈরি।
সুবিন্যাস্ত ফার্সি ভাষায় নোকতা বিহীন হরফ ও শব্দগুলো এমন আলংকারিক ও নৈপুন্যের সহিত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে  যা সহজেই দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষন করে। তবে শিলালিপিদ্বয়ের প্রাপ্ত হবফ গুলোর পাঠোদ্ধার ছিল খুবই দুষ্কর। Dr paul Horn, Epigraphia India vall ll- নামক গ্রন্থের ২৮৮ পৃষ্ঠায় সর্বপ্রথম ঐ শিলালিপির ছাপ প্রত্যক্ষ করে উহার পাঠ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু পাঠের মূলকথা অস্পষ্ট থেকে যায়। পরিশেষে ১৯৩৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ জনাব শামছ উদ্দিন এম,এ উহার সঠিক পাঠোদ্ধার করেন।
শিলালিপি পাঠ  করে জানা যায় যে, জত্তহর আলী খানের পুত্র  নবাব মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৫৮২ খ্রিষ্ঠাব্দে মসজিদটি নির্মান কাজ শুরু করা হয়। মির্জা মুরাদ খান কাকশাল ছিলেন এই প্রদেশের শ্রেষ্ঠ পাঠান জায়গীরদার।
প্রাচীন এই মসজিদটি চারকোনো বাঁকা প্রকান্ড আকারের চারটি মিনার আর চওড়া দেওয়ালের ওপর ভর করে  নিদারুন দাড়িয়ে আছে।এহাড়াও মসজিদটির ওপরে তিনটি সম পরিমান বৃহত আকৃতির তিনটি গুম্বুজ রয়েছে।
প্রাচীন এ মসজিদটির মোট জায়গার পরিমান ৫৯ শতাংশ। মসজিদটির বাহিরের দৈঘ্য ৫৭ ফুট এবং প্রস্তু-২৪ ফুট ভেতরের দৈঘ্য ৪৫ ফুট প্রস্থ ১২ ফুট। মসজিদটির চারদিকে দেওয়ালের পুরুত্ব ৬ ফুট। সামনে একটি মূল দরজা থাকলেও মসজিদটি উত্তর ও দক্ষিন দিকে মধ্যস্থলে আরো দুটি দরজা রয়েছে।
 প্রবেশ দ্বারের ডান পার্শ্বের  শিলালিপিখানা, বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি জাদুঘরে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাম পার্শ্বেরটি এখনও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। শিরোনাম ব্যাতীত শিলালিপিতে ১৪ টি পংক্তি রয়েছে। প্রথম পংক্তিতে প্রতিষ্ঠাতা দাতা ব্যক্তির নাম ও প্রতিষ্ঠাতা সাল সহ দিন, তারিখ উল্লেখ আছে। পরবর্তী ১২টি  পংক্তিতে দুটি কবুতরের  নাম সহ, অলৌকিক কাহিনী উল্লেখ রয়েছে। কাহিনীটি এমন, দুটি কবুতর ফকির আব্দুস সামাদের নিকট উপস্থিত হন হয়ে সালাম ও অভিবাদন করে উক্ত মসজিদে তারা ও তাদের বন্ধুদের অবস্থানের জন্য আশ্রয় কামনা করে, পরবর্তীতে তার ওপর ভিত্তি করে মসজিদটি নির্মিত হয়।
 ডান পাশের শিলালিপিতে ১১ টি পংক্তি যুক্ত এবং ইহাতে ধর্মীয়  বানী উৎকীর্ণ ছিলো। তবে এখানে একটি অসঙ্গতি লক্ষ করা যায় যে, মসজিদের মতো পবিত্রগৃহে স্থাপিত ফলকের শিরনামে  আল্লাহ তায়ালা অথবা বিসমিল্লাহ না লিখে বিকল্প উপশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা কিনা একান্তই বেমানান ও চরম অসংগতিপূর্ণ। অনুমান করা হয়ে থাকে যে সম্রাট আকবরের রাষ্ট্রীয় প্রভাবই ইহার মূল কারন। কেননা তিনি তখন রাজ্যময়, দ্বীনে ইলাহী নামক একটি ধর্মমতের প্রবর্তন করেন। তারই অনুসরণে হয়ত  সরাসরি আল্লাহ অথবা বিসমিল্লার পরিবর্তে এমন উপশব্দের ব্যবহার হয়েছে।
মাজিদটি নির্মানে ইট, চুন, সুরকি ব্যবহার করা হয়েছে এবং সামনের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে কুষ্টি পাথর সমতুল্য কৃষ্ণ শিলায় উৎকৃীর্ণ  শিলালিপি। শিলালিপিতে স্থান পাওয়া নোকতা বিহীন হরফগুলো মসজদটি নির্মানের সাল ও নির্মাতার নাম পরিচয় প্রদান করে।
প্রাচীন মসজিদটির চার পাশে রয়েছে কবুতরের
বসবাসের জন্য ছোট ছোট কয়েকশত ঘর, যেগুলো এখন শালিক পাখির দখলে। এছাড়াও চারপাশে রয়েছে আম, তাল, জাম, বট ও ঝাট গাছ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই স্থাপনাটির চারপাশে ইটের তৈরি প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে সেই সাথে সুরক্ষার জন্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে মাঝারি উচু লেভেলের  লোহার রেলিং।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাহয়তায়  মসজিদটির সংস্কারনের কাজ করে এখানে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সহিত আদায় করার পাশাপাশি প্রতি শুক্রবারে এখানে জুম্মার সালাত আদায় করা হয়।সেই সাথে মুসলমানদের পবিত্র দুটি ঈদের নামাজও এখানে আদায় করা হয়।
এমন একটি স্থাপত্য কর্ম ইতিহাসের পাতায় যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে অপরদিকে এটি তৎকালীন মুঘল ও সুলতানী শাসনামলের কারিগরী দক্ষতা ও তাদের শৌল্পিক রুচিবোধ সর্ম্পকে তথ্য দেয়। সর্বোপরি বলা যায়, খেরুয়া মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং  এটি বাংলার স্থাপত্য-ঐতিহ্যের এক মূল্যবান দৃষ্টান্ত। এর গম্বুজ, অলংকরণ ও নির্মাণশৈলী আমাদের ইতিহাসের সমৃদ্ধতা এবং সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। তাই এই মসজিদকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা আমাদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।
সাদ্দাম হোসেন
শিক্ষার্থী (ইতিহাস বিভাগ),
জাহাঙ্গীরনগর  বিশ্ববিদ্যালয়
এ বিভাগের আরো সংবাদ
© দেশ বুলেটিন 2023 All rights reserved
Theme Customized BY ITPolly.Com