খামেনিকে নিয়ে কিছু বিস্ময়কর তথ্য:
২৭ জুন, ১৯৮১।
তেহরানের ‘আবুজার মসজিদ’-এ জোহরের নামাজ শেষ করলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ধারিত বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে রাখা একটি টেপ রেকর্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।
বিস্ফোরণের পর যখন রেকর্ডারটি চেক করা হয়, তখন তার ভেতরে একটি ছোট চিরকুট পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল: “ফোরকান গ্রুপের পক্ষ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উপহার।” বোঝা গেল, টেপ রেকোর্ডারের ভেতরে ছিল শক্তিশালী বোমা।
এই বিস্ফোরনে খামেনির বুক, ডান কাঁধ এবং ডান হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুসফুস ছিদ্র হয়ে যায়, সাথে প্রচুর রক্তক্ষরণ।চিকিৎসকদের মতে, তিনি যে বেঁচে ফিরেছেন তা ছিল এক কথায় অলৌকিক।
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ডান হাতের স্নায়ু বা নার্ভগুলো পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। ডাক্তাররা কয়েক ঘণ্টা অস্ত্রোপচার করেও হাতটি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেননি। এর ফলে তাঁর ডান হাতটি চিরতরে অচল বা প্যারালাইজড হয়ে যায়।
তবুও এক হাত দিয়ে কাঁপিয়েছেন বিশ্ব।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির লেখা একটি বই ভীষণ জনপ্রিয়।বইটার নাম ‘Palestine’। ৪১৬ পৃষ্ঠার এই বইটিতে তিনি ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে এমন সুনিপুণ ম্যাপ আর গাণিতিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন যা অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষককে অবাক করেছে। বইটি পড়লে ধারণা পাওয়া যায়, কতটা রণকৌশলী মস্তিষ্ক ছিল খামেনির।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিশ্বের একমাত্র ধর্মীয় নেতা যাকে ‘টাইম’ এবং ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন বারবার বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সেখানে তাঁকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার এক ইশারায় বিশ্ব তেলের বাজার ও ভূ-রাজনীতি তোলপাড় হতে পারে।
অনেকেই জানেন না যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একজন বড় মাপের আধ্যাত্মিক সাধক বা ‘আরিফ’। তিনি ইসলামের গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন বা ‘ইরফান’-এ বিশ্বাসী। তিনি মনে করেন, স্রষ্টার সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য শুধু নামাজ-রোজার পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা এবং দুনিয়াবি মোহ ত্যাগ করা জরুরি। তাঁর শান্ত ও ধীরস্থির আচরণের পেছনে এই আধ্যাত্মিক চর্চার বড় প্রভাব দেখেন বিশ্লেষকরা।
খামেনি ‘বেলায়াত-এ-ফকিহ’ দর্শনে বিশ্বাসী। এর সহজ মানে হলো—যতক্ষণ পর্যন্ত ইমাম মাহদী সশরীরে ফিরে না আসছেন, ততক্ষণ একজন যোগ্য এবং ন্যায়পরায়ণ ইসলামি আইনবিদ মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেবেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর এই রাজনৈতিক ক্ষমতা আসলে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব।
অনুসারী মনে করেন, খামেনি আসলে ইমাম মাহদীর আগমনের পথ প্রস্তুত করছেন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রায়ই বলেন, বিজ্ঞান এবং ইসলাম একে অপরের পরিপূরক। একারণেই ইরানে তাঁর শাসনামলে স্টেম সেল রিসার্চ, ন্যানো টেকনোলজি এবং মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা অনেক রক্ষণশীল মুসলিম দেশে নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করা হয়।
খামেনির সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ হলো তাঁর দেওয়া একটি বিশেষ ফতোয়া। এর মাধ্যমে তিনি সুন্নিদের অপমান করা হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি মনে করেন, শিয়াদের মধ্যে যারা সুন্নিদের আবেগ নিয়ে কটূক্তি করে, তারা আসলে ইসলামের শত্রু এবং ব্রিটিশ বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার চর।
যেকারণে শিয়া নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইসলামিক জিহাদ-এর মতো সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বছরের পর বছর ধরে সামরিক ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। ভূ-রাজনীতিতে এটি একটি বিরল ঘটনা, যেখানে একজন শিয়া নেতা সুন্নিদের স্বার্থে এত বড় ঝুঁকি নেন।
প্রজ্ঞাবান বিশ্বনেতাদের চাইলেই শেষ করা যায় না। বিনম্র শ্রদ্ধা, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
( সংগৃহীত)