পাহাড়ি সীমান্তবর্তী নেত্রকোণার দুর্গাপুরে উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এই অঞ্চলে বাঙালিদের সাথে সমান তালে স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীরা। শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাঙালি শিক্ষার্থীদের সাথে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান নিচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। তবে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে আছে এসব শিক্ষার্থীরা।
ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর ভাষা টিকিয়ে রাখতে ২০১৯ সাল থেকে সরকার প্রাক প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত চাকমা, মারমা, গারো সহ পাঁচটি সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজ ভাষার বিশেষ বই বিতরণ করে আসছে সরকার। এর মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে শুধুমাত্র গারো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা এই বই পাচ্ছে এরই অংশ হিসাবে দুর্গাপুর উপজেলতেও বিশেষ এই বই পেলো গারো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা। তবে ২০২০ সালের পর করোনা কালীন সংকট সহ নানা জটিলতার কারণে প্রায় ৪ বছর পর আবারো নতুন করে আলোর মুখ দেখলো ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার বই বিতরণের এই কার্যক্রম।
এবছর দুর্গাপুর সহ পার্শ্ববর্তী কলমাকান্দা ও পূর্বধলায় বিতরণ করা হয়েছে সর্বমোট ৯শ ৪৪ জন গারো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ৪ হাজার ৮শত পিস আংনি গারো কিতাব নামে ইংরেজি ভাষায় সংস্করণে গারো ভাষার বিশেষ এই পাঠ্য বই।
গারো সম্প্রদায়ের নিজস্ব কোন বর্ণমালা না থাকায় বইগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ইংরেজিতে। এই বই পড়ে নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিশেষ এই বইয়ের শিক্ষক না থাকার কারনে শিক্ষার্থীদের পড়াতে শিক্ষকদের কিছুটা বেগ পোহাতে হচ্ছে। তাই বিদ্যালয়ে গুলোতে এই বই পাঠদানের জন্য বিশেষ শিক্ষক নিয়োগ সহ মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত বিশেষ এই বই সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
গারো সম্প্রদায় ছাড়াও এই অঞ্চলের টংক আন্দোলন সহ নানা ইতিহাসের সাক্ষী হাজং সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদেরও দীর্ঘদিনের দাবি তাদের নিজস্ব ভাষা পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ করে বিশেষ বই প্রদান করা। পাশাপাশি নিজস্ব ভাষার বইগুলো বাংলা ভাষায় লিপিবদ্ধ করার দাবি তুলেও ধরেন এই সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি কর্মীরা।
বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক সুজন হাজং জানান, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা, চর্চা এবং তা বিকাশের জন্য নিরন্তর হবে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই সরকার বেশ কিছু উদ্যোগও হাতে নিয়েছেন এর মাঝে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা সহ তাদের নিজস্ব ভাষা যেন বেঁচে থাকে বাংলার পাশাপাশি তারা যেন তাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারে,গান লিখতে পারে, কবিতা লিখতে পারে। সেজন্য সরকার এরিমধ্যে পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় বই বিতরণ করছে। এর মধ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে গারো ভাষার শিক্ষার্থীরা এই বই পাচ্ছে। এই অঞ্চলে হাজং সম্প্রদায়ের বড় একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। দুর্গাপুর সহ আশপাশের অঞ্চলে হাজং সম্প্রদায়ের সুদীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের রয়েছে বীরত্বগাথা। টংক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সহ নানা ইতিহাস। তাই এই সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষার বই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান খান জানান, কিছু বছর বন্ধ থাকার পরে এ বছর থেকে নতুন করে আবারও গারো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে গারো ভাষার বিশেষ বই বিতরণ করা হচ্ছে। মূলত এই সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই সরকারের এই উদ্যোগ। ইতিমধ্যে জেলার প্রায় ৯৪৪ জন শিক্ষার্থীদের মাঝে এই বই বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও এই অঞ্চলে আরো বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। যাদের শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছেন। তাই অন্যান্য ভাষাভাষীর বই পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।