অবহেলিত একটি জনপদ ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসন। যেখানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বাস। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি উপজেলার তুলনায় বিভিন্ন দিক থেকে এখনো পিছিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ দুর্দশা।
যার কারণ হিসেবে আসনটিতে বারবার বহিরাগত এমপি নির্বাচিত হওয়া এবং বিগত ৪০ বছর ধরে এই আসন থেকে কোন সরকার মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী না দেওয়া বলে মনে করছেন উপজেলার সচেতন মহলের লোকজন।
প্রসঙ্গত ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইব্রাহিম জজ। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এখান থেকে এমপি হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ারুল কাদির। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির জয়নাল আবেদীন জায়েদী।
এ ছাড়া ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাশিম উদ্দিন আহমেদ, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম, ১৯৯১ সালে বিএনপির খুররম খান চৌধুরী, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস ছাত্তার, ২০০১ সালে বিএনপির শাহ নুরুল কবীর শাহিন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস ছাত্তার এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফখরুল ইমাম এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ হাসান সুমন। ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।
এই আসন থেকে জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হাশিম উদ্দিন আহমেদ পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এরপর আর কোনও সরকারের আমলেই ময়মনসিংহ-৮ ঈশ্বরগঞ্জ আসনে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী নির্বাচিত হয়নি। বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে মন্ত্রীবিহীন ও বহিরাগত এমপিদের এ আসনটিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, শিল্প-কারখানা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আসনটিতে উন্নয়নের স্বার্থে মন্ত্রী দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ স্থানীয়রা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। ঈশ্বরগঞ্জবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল এবার  আসনটিতে থেকে মন্ত্রী হবে। কিন্তু গত মঙ্গলবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রীসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলে ভেস্তে ঈশ্বরগঞ্জবাসীর সেই স্বপ্ন। এতে উপজেলার অনেক বাসিন্দা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিতেও দেখা গেছে।
ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি ও ঈশ্বরগঞ্জ সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের এলজিপি(সরকারি কৌসুলি) অ্যাডভোকেট এ এস এম সারোয়ার জাহান বলেন, ‘এই আসনে বহিরাগত ফখরুল ইমাম ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তাবেদারি করে তিনবার বিনা ভোটে এমপি হয়ে ঈশ্বরগঞ্জবাসীকে উন্নয়ন বঞ্চিত করেছে। কিন্তু এবার জনগণের প্রত্যক্ষ ব্যালটের রায়ে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জনতার এমপি ইঞ্জিনিয়ার লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাকে ঘিরে ঈশ্বরগঞ্জের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। মন্ত্রীত্বটা অন্য বিষয়, শুধু এতটুকু বলতে পারি এবার ঈশ্বরগঞ্জবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন হবে। কয়েকজন মন্ত্রী যা না পারবে লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু তা করে দেখাবেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ-৮ আসনের  নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু বলেন, ‘আসনটিতে বারবার বহিরাগত লোকজন এমপি হয়েছে। যেকারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। জনগণ আমার ওপর আস্থা রেখে যে দায়িত্ব দিয়েছে আমি তার ব্যত্যয় হতে দিব না। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, মাদক ও ক্যাসিনো মুক্ত ঈশ্বরগঞ্জ আমি গড়ে তুলবই। কিন্তু আমার কাছে বেশি প্রায়োরিটি হচ্ছে ঈশ্বরগঞ্জের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন করা। পাশাপাশি তরুণদের জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। আর মন্ত্রীত্বটা আলাদা একটা ব্যাপার। এটা নিয়ে আমার তেমন কিছু বলার নেই।’