ধর্ষণে রক্তাক্ত বাংলাদেশ: দায় কার, নীরব কেন ক্ষমতাধররা? বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা এবং বিকৃত সমাজমানসের যৌথ ফল। প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে—এ দেশে নারী ও শিশুর শরীর সবচেয়ে সস্তা, আর বিচার সবচেয়ে দুর্লভ।
বিশিষ্ট মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সমস্যা শুধু অপরাধ বৃদ্ধিতে নয়; ভয়াবহ সত্য হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের হার যেভাবে বাড়ছে, তা সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় পাঁচজন গ্রেপ্তার হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—এত বড় অপরাধ ঘটার পর রাষ্ট্র কেন জাগে? মামলায় সংশ্লিষ্ট যাদের নাম উঠে এসেছে, সেটা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক পরিচয় আজ অপরাধের ঢাল। এই ঘটনা সারাদেশে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছে—আইন কি কেবল দুর্বলদের জন্য?
শিশুদের জন্য নেই নিরাপদ বাংলাদেশ কারণ মাগুরায় ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু, ফরিদপুরে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, বান্দরবানে গর্ভবতী নারী ধর্ষণ—এসব শুধু ঘটনা নয়, এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল।
সাভারে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর এক শিক্ষার্থীর ধর্ষণ মামলায় তদন্ত চললেও সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায়? নারায়ণগঞ্জে এক ছাত্রীর গ্যাং-রেপ ঘটনায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন অভিযুক্ত আটক করলেও দেরিতে মামলা রেকর্ড ও পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণ করে—আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আর্তনাদ।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা, যার মধ্যে ১০৬টি দলবদ্ধ ধর্ষণ—এই সংখ্যা কেবল হিসাব নয়, এগুলো রক্তাক্ত আর্তনাদ। গড়ে প্রতি ৯ ঘণ্টায় একজন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে—এটা কি উন্নয়নশীল দেশের পরিচয়?
সরকার ধর্ষণবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন—সবই আছে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশি দেরি, প্রমাণ নষ্ট, রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক গুজব—সব মিলিয়ে বিচার ব্যবস্থা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল রাখা হয়েছে।
এই বিকৃত সমাজ কাদের তৈরি? যারা ক্ষমতায় বসে নীরব থাকে, যারা দলীয় পরিচয়ে অপরাধ ঢাকে, যারা বিচারকে প্রহসনে পরিণত করে—তারা কি ধর্ষকদের চেয়ে কম অপরাধী?
বাংলাদেশ যদি সত্যিই মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে অপরাধীর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাবান পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও। নইলে প্রতিটি বিচার শেষ হবে ভুক্তভোগীর চোখের কান্না আর বিস্ময়ে।
বিচারের বাণী আজ নিভৃতে কাঁদছে—কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কতদিন?