রাজধানীর মহাখালী সাততলা বস্তি একাধিকবার উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছু হটেছে সরকার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা বস্তিবাসীর পক্ষে। বস্তি উচ্ছেদে সরকার উদ্যোগ নিতে গেলে সবাই একসঙ্গে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। উচ্চ আদালতে মামলা করে বছরের পর বছর ধরে বস্তি উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত করে রাখা হয়েছে। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ সফল হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খোদ জনপ্রতিনিধির সহযোগিতায় মহাখালী সাততলা বস্তিতে একের পর এক বৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সাততলা বস্তির ভেতরে পাকা রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। চলছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজ। বস্তিতে একের পর এক পাকা দালান গড়ে তোলা হচ্ছে। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাত ভবন নির্মাণ কাজ কবে শুরু হবে তা অনিশ্চিত।
প্রায় ৯ বছরের বেশি সময় আগে মহাখালীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন সাত প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা ও ভবনের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু জমি বেদখলে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ এখনো শুরু হয়নি।
সাতটি প্রতিষ্ঠান হলো- বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন, ইপিআই ভবন, সেন্টার ফর মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজি ভবন, জাতীয় ব্লাড সেন্টার ভবন, সেবা পরিদফতরের প্রধান কার্যালয় এবং অটিস্টিক একাডেমি ভবন।
মহাখালীতে জাতীয় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জমি ৪৭ দশমিক ৮৮ একর এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ৩৫ একর জমি আছে। এই জমি থেকে প্রায় দশ একর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। যা সাততলা বস্তি নামে পরিচিত।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, অধিদফতরের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে বৈঠক করে। বৈঠকে মহাখালীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স তৈরির আলোচনা হয়। বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের ব্যাপারে সিদ্ধান্তও হয়। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর মহাখালীর সাততলা বস্তি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু আদালতের হস্তক্ষেপে অধিদফতর জায়গাটি দখলে নিতে পারেনি। কিন্তু দিন দিন বেড়েই চলছে সাততলা বস্তির পরিধি।
এর আগে এ বস্তি উচ্ছেদে প্রথম ২০০৩ সালে নোটিশ জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই সময় বস্তিবাসীর পক্ষে ওমর ফারুক নামের একজন ব্যক্তি হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের শুনানি শেষে বস্তি উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন হাইকোর্ট। আবার ২০১০ সালে উচ্ছেদের চেষ্টা চালায়ে ব্যর্থ হয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
সরেজমিনে জানা যায়, রাজনৈতিক দলের নেতারা দখল করে রেখেছে এ জায়গা। বহু উপরের মহলকে রাজনৈতিক সুবিধাদি দিয়ে তারা এখানে ঘরবাড়ি তুলে ভাড়া দিয়েছেন, এছাড়া অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির লাইনেরও ব্যবসা করা হচ্ছে। ওয়ার্ডের অনেক রাজনৈতিক নেতারাও এই বস্তিতে ঘর নির্মাণ করে বসবাস করেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের ক্লাবও আছে সাততলা বস্তিতে। এখান থেকে মাসে আয় হয় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মতন বলে ওই এলাকার একজন আওয়ামী লীগ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে এ প্রতিবেদককে জানান।
সর্বশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাততলা বস্তি উচ্ছেদ করতে বস্তিতে বসবাসরত সকল বাসিন্দাকে এক সপ্তাহের মধ্যে জায়গা খালি করে অন্যত্র চলে যাওয়ার নোটিশ দেয় বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) কর্তৃপক্ষ। প্রায় ১০ একর জায়গা সীমানা নির্ধারণ করে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেয়। নোটিশ দেওয়ার পরের দিন ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদ করতে গেলে বাঁধার মুখে পড়ে। পরে বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদে মহাখালীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে সাততলা বস্তির বাসিন্দারা। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ তারা মেনে নেবেন না উল্লেখ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বস্তি সংক্রান্ত একটি মামলা এখনো বিচারাধীন বলে জানান তারা। এসময় অবরোধের কারণে মহাখালীতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ নাছিরের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেয় বস্তিবাসী। এভাবেই আবার আটকে যায় সাততলা বস্তি উচ্ছেদ।