প্রায় আট মাসের স্থবিরতা কাটিয়ে বরগুনার উপকূলীয় শুঁটকিপল্লীগুলোতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তালতলী উপজেলার আশারচর, নিদ্রারচরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে হাজারো জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর ব্যস্ততায় আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে শুঁটকি শিল্প। মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মৌসুমের শুরুতেই পুরোদমে কাজে নেমেছেন জেলেরা।
বরগুনা জেলায় শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ১২ থেকে ১৫ হাজার নারী-পুরুষ। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-এই চার মাসই শুঁটকি মৌসুমের মূল সময়। তবে প্রস্তুতি শুরু হয় অক্টোবর থেকেই। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জেলে ও শ্রমিকরা পরিবারসহ তালতলীর শুঁটকিপল্লীগুলোতে এসে মৌসুমজুড়ে কাজ করেন।
মিঠাপানির দেশি মাছের শুঁটকির জন্য পরিচিত আশারচর ও নিদ্রারচরে এ মৌসুমে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পল্লী থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০ মণ শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
শুঁটকিপল্লীতে কাজ করা শ্রমিক মালেক বলেন, “নদীতে মাছ ভালো ধরা পড়ছে। কাঁচা মাছের দাম তুলনামূলক কম থাকায় এ বছর লাভের আশা করছি। সরকারিভাবে রপ্তানির সুযোগ থাকলে আমাদের আয় আরও বাড়ত।”
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৫০টি অস্থায়ী টংঘরে জেলে ও শ্রমিকদের বসবাস। কেউ মাছ পরিষ্কার করছেন, কেউ মাচায় সাজাচ্ছেন, আবার কেউ শুকনো মাছ বস্তাবন্দী করছেন। নদী থেকে আনা কাঁচা মাছ নারী ও শিশু শ্রমিকরা পরিষ্কার করে রোদে শুকান। তিন থেকে চার দিনের রোদে মাছ শক্ত হয়ে ওঠে।
শুঁটকি ব্যবসায়ী রিয়াজুল ইসলাম জানান, “এ বছর কোনো রাসায়নিক বা অতিরিক্ত লবণ ছাড়াই শুঁটকি উৎপাদনের চেষ্টা করছি। সাগরপাড়ে ভালো রোদ পাওয়ায় এখানে অস্থায়ীভাবে কাজ করছি। স্থায়ী জায়গা পেলে সারা বছরই ব্যবসা করা যেত।”
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ২৫–৩০ প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি হয়। এর মধ্যে রূপচাঁদা, ছুরি, লইট্টা, তপসে, কোরাল, সুরমা ও চিংড়ি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ছুরি মাছের শুঁটকি প্রতি কেজি ৭০০–৮০০ টাকা, রূপচাঁদা ১,০০০–১,৫০০ টাকা এবং লইট্টা ৬০০–১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে গুরুতর সংকট। প্রধান সড়ক থেকে শুঁটকিপল্লী পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা ভাঙাচোরা থাকায় ট্রাক ঢুকতে পারে না। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী আবু জাফর বলেন, “আমরা প্রতিবছর সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছি, কিন্তু রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন নেই। সরকারিভাবে রপ্তানির ব্যবস্থা হলে এই শিল্প টিকে থাকবে।”
শুঁটকিপল্লীতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের দুর্ভোগ আরও প্রকট। দুই যুগ ধরে কাজ করা পিয়ারা বেগম বলেন, “নারীদের জন্য কোনো স্থায়ী টয়লেট নেই। টিউবওয়েল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকলে আমাদের কষ্ট অনেক কমত।”
তালতলীর সোনাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ ফরাজি বলেন, “এক সময় এই শিল্পের সঙ্গে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত ছিল। এখন অবকাঠামো সংকট ও পরিবেশ দূষণে শিল্পটি হুমকির মুখে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপরিশোধিত বর্জ্যে সাগরের পানি দূষিত হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমছে।”
বরগুনার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, “শুঁটকি শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। এর সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তালতলীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেবক মণ্ডল জানান, “শুঁটকিপল্লীর সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকদের মানবিক সুযোগ-সুবিধা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত না হলে উপকূলের এই ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় শিল্প অচিরেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।