মুসলিমদের প্রাণকেন্দ্র, ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি: একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। লিখেছেনঃ এস এম আবদুল বারেক (সাংবাদিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক) ঃ ২৬-১০-২০২৬, প্রকাশের আবেদন।

♦️সৌদি রাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইসলামের ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহের সংরক্ষণ ও বিলোপ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ফিলিস্তিন সংকটের মতো সংবেদনশীল ও মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বর্তমান সময়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামি মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের আলোকে বিষয়গুলোর একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সুসংগঠিত পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ‘সৌদি‘ নামকরণ, ওয়াহাবি মতবাদ ও ১৯৩২ সালের ঐতিহাসিক পটভূমি

ঐতিহাসিকভাবে, আল আরব মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র ঈমানি রাজধানী। যেখানে রয়েছেন মুসলমানদের সর্বোচ্চ প্রিয় দরবারে আজম ও খানায়ে কাবা মহান আল্লাহতা‘আলার ঘর। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্ব মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিরাজমান। যেখানে প্রতি বছর হজ করার উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানরা যাই তাদের নিজস্ব প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু  আল আরব বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র ও ঐ ষড়যন্ত্রে আল আরব ভেঙ্গে খন্ড বিখন্ড হয় এবং এই ইহুদির দাস সৌদি ওহাবি গোত্রবাদীদের উত্থানের পর থেকে মুসলমানদের নিজস্ব অবস্থান ছারখার হয়ে যায়।

সৌদি রাষ্ট্রের উত্থান: এটা এক বিশাল ইতিহাস, যা নিয়ে আমি আর একটি প্রবন্ধ রচনা করব। সংক্ষেপে : বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায়, ইহুদিদের খুশি করার লক্ষ্যে এবং আর্ধ পৃথিবী ইসলামের ছায়াতলে তা অসহ্যকর মনে হওয়ায়, মুসলমানদের নেতৃত্ব হীনতার কারণে, বারবার ভূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে, জ্ঞান বিজ্ঞানের পিছিয়ে থাকার কারণে,  উসমানীয়দের চরম পতনের পর ‘ ইহুদীর দাস আল সৌদ‘ (আলে সৌদ) পরিবার হিজাজ ও নজদ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

নামকরণ বিতর্ক: ১৯৩২ সালে ইবনে সৌদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভূখণ্ডের নাম পরিবর্তন করে নিজের রাজবংশ বা গোত্রের নামানুসারে “সৌদি আরব” (Kingdom of Saudi Arabia) রাখেন মানে পুনরায় আরও গভির মুলুকিয়ত কায়েম হয়। ইতিহাসবিদ ও সাধারণ মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের মতে, পবিত্রতম ভূখণ্ডকে কোনো একক গোষ্ঠী/ রাজপরিবার বা নির্দিষ্ট বংশের নামে নামকরণ করা ঐতিহাসিক ও ইসলামি সার্বজনীনতার দৃষ্টিতে শতভাগ বিতর্কিত। মুসলমানদের সার্বজনীন অধিকার, তাদের প্রাণকেন্দ্র পুনরায় ইসলামের বিধান বিরুধী একক গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়।

২. ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শনসমূহ ধ্বংসের প্রেক্ষাপট

সৌদি রাজপরিবার তাদের শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমর্থনে শেখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের অনুসৃত ‘ওয়াহাবি‘ বা ‘সালাফি‘ মতবাদকে গ্রহণ করে। এই মতাদর্শের একটি মূল নীতি ছিল— ইসলামের সকল নির্দেশ ভেঙে দেয়া, যার জন্য তারা পবিত্র আহলে রাসুল, মকবুল সাহাবায়ে কেরাম, আঈমায়েকেরাম এর পবিত্র মাজার শরিফ  ও ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে শিরক ও বিদআতের চর্চা হচ্ছে এমন মিথ্যার রটনা রটিয়ে মহান আল্লাহতা‘আলা সকল নিদর্শন সমূহ ভেঙে দেয়, যেমন সাফা মারওয়া, জান্নাতুল বাকী, জান্নাতুল মোয়াল্লা, আরাফাতের ময়দান ইত্যাদি আমাদের পবিত্র নিদর্শন সমূহ।

ঐতিহাসিক নিদর্শন বিলোপ: এই নীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে ১৯২৫–১৯২৬ সালে মদিনার ঐতিহাসিক জন্নাতুল বাকী এবং মক্কার জন্নাতুল মুআল্লাহ-তে অবস্থিত আহলে বায়াত, সাহাবি এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনের রওজা ও ঐতিহাসিক গম্বুজসমূহ ভেঙে সমতল করে দেওয়া হয়। এমনকি প্রাণাধিক প্রিয়নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারক ধ্বংসেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়, যা মহান আল্লাহর বিশেষ কৃপায় রক্ষিত হয়।

বিশ্ব মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া: প্রাণাধিক প্রিয়নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের স্মারক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংসের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানদাররা এটার জন্য হাহাকার করছে। বিশ্ব সুন্নী আন্দোলন এর প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা ইমাম হায়াত এই দিনটিকে ‘আঁধার দিবস‘ (Dark Day) ইয়াওমে জুলুমাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই দিনেই পবিত্র আল আরব পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম জারি রেখেছেন।

♦️৩. আল-আরব খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার ঐতিহাসিক কারণ ও ভুলসমূহ

এককালের ঐক্যবদ্ধ আরব ভূখণ্ড খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কারণ ও ভুল সিদ্ধান্ত দায়ী:

° পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী নীলকশ (Sykes-Picot Agreement): ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে গোপনে ‘সাইকস-পিকট চুক্তি‘ সম্পাদিত হয়। এতে উসমানীয় সাম্রাজ্য ভেঙে পুরো আরব অঞ্চলকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার পরিকল্পনা করা হয়।

° কৃত্রিম সীমান্ত নির্ধারণ (Divide and Rule): ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো উপজাতীয়, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে কৃত্রিম রাজনৈতিক সীমানা তৈরি করে, যাতে আরবকে ভেঙে ফেলা যায়, খন্ড খন্ড দেশে পরিণত করা যায় এবং ওই দেশগুলো চিরকাল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে এবং কখনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি হতে না পারে।

° খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল খনিজ তেলের সন্ধান মেলে। এই সম্পদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতেই পশ্চিমা শক্তিগুলো ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরিকে প্রাধান্য দেয়।

৪. ঐতিহাসিক ভুল ও আরবদের দায়িত্ব

° মক্কার শরিফ হুসাইনের ভুল সিদ্ধান্ত: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মক্কার শাসক শরিফ হুসাইন বিন আলী ব্রিটেনের প্রলোভনে প্রলুব্ধ হন। উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে তাঁকে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন আরব সাম্রাজ্য‘ গড়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

° অভ্যন্তরীণ গৃহদাহ: পশ্চিমাদের আশ্বাসে ১৯১৬ সালে শরিফ হুসাইন ‘গ্রেট আরব রিভোল্ট‘ (মহাবিদ্রোহ) ঘোষণা করেন। এর ফলে মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় শাসনকাঠামো ভিতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পশ্চিমাদের দখলের সুযোগ তৈরি হয়।

° জাতীয়তাবাদের উত্থান: উসমানীয় শাসনের শেষভাগে তুর্কি জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়ায় আরবে ‘আরব জাতীয়তাবাদ‘ মাথাচাড়া দেয়। ইসলামি উম্মাহর ঐক্যের চেয়ে ক্ষুদ্র বস্তুবাদী জাতীয়তাবাদকে প্রাধান্য দেওয়া ছিল সে সময়ের এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিপর্যয়।

৫. প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলগত ভুলসমূহ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৯):

° জার্মানির পক্ষে যোগদান: বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সাথে অক্ষশক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অক্ষমনীয় ভুল প্রমাণিত হয়, যা তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

° পশ্চিমাদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস: উসমানীয়দের পতনের পর ব্রিটেন তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে; সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে অঞ্চল ভাগ করে নেয় এবং ১৯১৭ সালে ইহুদিদের জন্য ‘বেলফোর ঘোষণা‘ প্রদান করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫):

° ফিলিস্তিন বিভাজন ও প্রতিনিধিত্বের অভাব: বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে গঠিত জাতিসংঘে (UN) মুসলিম বিশ্বের জোরালো কোনো একক প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ফলে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।

° সামরিক ও রাজনৈতিক অনৈক্য: ব্রিটিশ বাহিনীর চক্রান্তে খন্ড বিখন্ড হওয়া ক্ষুদ্র আরব দেশগুলোর মধ্যে শক্তিশালী কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক সমন্বয় ছিল না। সবাই নিজস্ব ক্ষমতা ও ভূখণ্ড রক্ষায় ব্যস্ত থাকায় সর্বজনীন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি।

৬. বেলফোর ঘোষণা, ইসরাইল প্রতিষ্ঠা ও ব্রিটিশদের ভূমিকাঃ বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): মুসলমানদের খন্ড বিখন্ড হওয়ার ও অনৈক্যর সুযোগে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর একটি চিঠির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় হোম‘ বা রাষ্ট্র গঠনে যুক্তরাজ্যের সমর্থনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

° ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন: এই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের ১৮১ নম্বর দেশভাগ প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনের বুকে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়।

৭. ফিলিস্তিনের অবক্ষয় ও পশ্চিমা-আরব আঁতাতঃ পশ্চিমা সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিকভাবে ইসরাইলকে নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে।

° আরব শাসকদের ভূমিকা: ব্রিটিশ বাহিনীর মদত পুষ্ট কিছু লোক ওই আরবের খন্ড বিখন্ড হওয়া রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়। মীরজাফরের মত তারা ব্রিটিশ বাহিনীর কথায় তখন থেকে এখন পর্যন্ত উঠে আর বসে যেন এক একটি রোবট। ওরা নিজেদের রাজতন্ত্র ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে তারা আমেরিকা ও ইসরাইলের সাথে অনানুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। নিজেদের দেশে থাকা হাজার কোটি টাকার সম্পদ-খনিজ সম্পদ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ইঙ্গ মার্কিন বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। যার ফল এখন আরবের জনগণ ভোগ করছে আরো করবে। কারণ এরা তো শাসক নয় এরা তো সবাই কাঠের পুতুল ইঙ্গ মার্কিন বাহিনীর।

° বর্তমান সংকট: বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কোন মুসলমান নিরাপদ নয়, কারণ সবাই কোন না কোনভাবে ইঙ্গ মার্কিন বাহিনীর দাস গোলামে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সবাই নিজেদের নীতি-আদর্শ থেকে পথ মত থেকে অনেক অনেক দূরে সরে গেছে। যারা খেয়ে না খেয়ে পড়ে না পড়ে কলেমা কারবালার ধারা প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুহূর্তেই নিজ জীবন উৎসর্গ করেছে, আজ সেই মুসলমান নামধারী লোকগুলো বাতেল জালেম অপশক্তির দালালিতে রত, ব্রিটিশ আমেরিকার চক্র জালে পা দিয়ে নিজেদেরকে খন্ড বিখন্ড করে ওদের বলির পাঠায় পরিণত হয়ে আজ মুসলিম মিল্লাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। যে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সব মানুষের অধিকার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সার্বজনীন মানবিক সত্য ন্যায় জ্ঞানের মুক্ত প্রবাহ ভিত্তিক একটি দুনিয়া গড়ার জন্য স্বয়ং প্রাণাদিক প্রিয়নবী, আহলে রাসুল, মকবুল সাহাবায়ে কেরাম জীবন জিন্দেগি উৎসর্গ করতে এক চুল পরিমাণ দ্বিধাবোধ করে নাই আজ সেই সার্বজনীন মানবিক সব মানুষের অধিকার স্বাধীনতার খেলাফতে ইনসানিয়াত উৎখাত হয়ে গেল কারো মাথাব্যথা নেই। থাকবে বা কিভাবে সবাই যে মূল উকিয়াতের দাস দালাল হয়ে বসে আছে। বর্তমান সংকট একটাই  সব মানুষের অধিকার স্বাধীনতা ভিত্তিক সার্বজনীন মানবিক একটি দুনিয়া নাই পৃথিবীর বর্তমান সকল রাষ্ট্রই একক গোষ্ঠীর মুলকীয়ত, যেখানে প্রতিনিয়ত অন্য সকল গোষ্ঠী নিপীড়ন নির্যাতন জুলুমের শিকার হচ্ছে। 

৮. সত্য প্রকাশ ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানঃ ইহুদি-জায়নবাদী আগ্রাসন ও মুসলিম বিশ্বের সংকট পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও বাস্তবতার মেলবন্ধন অত্যন্ত স্পষ্ট:

° অন্যায়ের প্রতিবাদ মানবিক দায়িত্ব: অন্যায়, অবিচার, জুলুম, শোষণ মুলুকিয়তের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ মানুষের অন্যতম মানবিক দায়িত্ব। কোন মানুষ জেনে শুনে তা অবহেলা করতে পারে না, আর অবহেলাকারী মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে পারে না। পৃথিবীতে দুটি শক্তি বহমান একটা সত্যের শক্তি- আর একটা মিথ্যার শক্তি।

একদিকে সর্বজনীন মানবমুক্তির ঐক্য, অন্যদিকে স্বৈরশাসন ও শোষণের কারাগার।

১. সত্যের শক্তি: মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বজনীন মানবিক ঐক্য

সত্যের শক্তি কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণি, রাজপরিবার কিংবা শাসকগোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। সত্যের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের বিবেক, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সমান অধিকার ও স্বাধীনতার মধ্যে।

সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া মানে হলো—ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা, বৈষম্য ও আধিপত্যের ঊর্ধ্বে উঠে এমন একটি পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে একসঙ্গে দাঁড়ানো, যেখানে প্রত্যেক মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সমান অধিকার ভোগ করবে।

এখানে রাষ্ট্র মানুষের জন্য, আইন ন্যায়বিচারের জন্য এবং ক্ষমতা জনগণের অধিকার ও কল্যাণ রক্ষার জন্য। কোনো শাসক, রাজতন্ত্র কিংবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা অপরাধ নয়; বরং অন্যায় প্রতিরোধ করা মানবিক দায়িত্ব।

সত্যের শক্তি মানুষকে বিভক্ত করে না—মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। মানুষকে পরাধীন করে না—মুক্তির পথ দেখায়। মানুষকে ভীত করে না—নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে।

এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি সার্বজনীন মানবিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষের পরিচয়, বিশ্বাস, জাতীয়তা, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, প্রত্যেকের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।

২. মিথ্যার শক্তি: স্বৈর অপরাজনীতি, আধিপত্য ও শোষণের কারাগার

মিথ্যার শক্তি হলো এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা, যেখানে একটি ব্যক্তি, পরিবার, রাজপরিবার কিংবা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য সত্যকে আড়াল করে, মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণের অধিকারকে নিজেদের স্বার্থের অধীন করে রাখে।

এই ব্যবস্থায় মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের মাধ্যম না হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ন্যায়বিচারের পরিবর্তে চলে পক্ষপাত, জবাবদিহির পরিবর্তে চলে ক্ষমতার দম্ভ, আর জনগণের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে চলে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা।

এখানে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হয়, অবিচারকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, জুলুম-নির্যাতনকে ক্ষমতা রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং শোষণমূলক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে ভয়, বিভ্রান্তি, প্রচারণা ও অন্ধ আনুগত্যকে কাজে লাগানো হয়।

মুলুকিয়ত বা একক গোষ্ঠীর বা বস্তুর বা বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র বা অবৈধ অপরাজনীতি যখন জনগণের স্বাধীনতা, সমান অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন তা আধিপত্য ও অধিকারহরণের কাঠামোয় পরিণত হয়।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, শোষিত মানুষের একাংশকেও শোষণের ব্যবস্থার সমর্থকে পরিণত করা। ফলে মানুষ নিজের মুক্তির পরিবর্তে কখনো কখনো নিজের পরাধীনতার কাঠামোকেই রক্ষা করতে দাঁড়ায়।

মিথ্যার শক্তি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে না—অন্ধ আনুগত্যে আবদ্ধ করে। স্বাধীনতা দেয় না—নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না—অন্যায়কে ক্ষমতার আড়ালে রক্ষা করে।

এর পরিণতি হলো এমন এক অপরাজনৈতিক ও সামাজিক কারাগার, যেখানে মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, অধিকার সংকুচিত হয়, প্রতিবাদ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতাবানদের স্বার্থ সাধারণ মানুষের জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়।

৩. মূল দর্শন: মানুষ কি ক্ষমতার জন্য, নাকি ক্ষমতা মানুষের জন্য?

এই প্রশ্নের মধ্যেই সত্য ও মিথ্যার শক্তির মৌলিক সংঘাত নিহিত।

যে ব্যবস্থা মানুষের স্বাধীনতা, সমান অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেয়, তা মানবমুক্তির পথকে শক্তিশালী করে। আর যে ব্যবস্থা মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের ক্ষমতা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তা মানুষের মুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

তবে সত্যের পক্ষে থাকার অর্থ শুধু নিজের বক্তব্যকে সত্য বলে ঘোষণা করা নয়; বরং নিজের পক্ষের ভুলও স্বীকার করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একই নৈতিক অবস্থান বজায় রাখা। প্রত্যেকে তার মত পথ চিন্তা চেতনা নিয়ে যেন বাঁচতে পারে কেউ কারো সত্য যেন অন্যের উপর না চাপায় এটাই।

এক কথায়, সত্যের শক্তি হলো—সকল মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সার্বজনীন মানবিক পৃথিবী গড়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

মিথ্যার শক্তি হলো—একটি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আধিপত্য, স্বৈর অপরাজনীতি, অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও শোষণকে টিকিয়ে রাখতে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকারকে বন্দি করে রাখা।

উপসংহারঃ সৌদি রাজতন্ত্র ও ওয়াহাবি মতাদর্শের উত্থান, পবিত্র নিদর্শনসমূহ ধ্বংস এবং আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা শক্তির সাথে আরব শাসকমহলের ঘনিষ্ঠতা—এসবই ঐতিহাসিক সত্য ও দলিল দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং, কোনো মুসলিম যদি পবিত্র ভূমির মর্যাদা রক্ষা এবং ফিলিস্তিনসহ বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের ওপর জুলুমের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করে, তবে তা কোনো ব্যক্তি বা দেশের প্রতি বিদ্বেষ নয়; বরং তা ন্যায়বিচার ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পক্ষে একটি অবস্থান। আর এটাই ঈমান, কলেমার শপথ, মহান আল্লাহতা‘আলার নির্দেশ। এখনো সময় আছে, আসুন সত্যের বিপ্লবী অভিযাত্রায় সব মানুষের অধিকার স্বাধীনতা ভিত্তিক সার্বজনীন মানবিক দুনিয়া খেলাফতে ইনসানিয়াত পুনঃ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে তুলি বস্তুর উর্ধ্বে মানবসত্তার প্রবক্তা আল্লামা ইমাম হায়াত প্রবর্তিত ইনসানিয়াত বিপ্লব। এতেই সব মানুষের মুক্তি।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

মুসলিমদের প্রাণকেন্দ্র, ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি: একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ। লিখেছেনঃ এস এম আবদুল বারেক (সাংবাদিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক) ঃ ২৬-১০-২০২৬, প্রকাশের আবেদন।

♦️সৌদি রাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইসলামের ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহের সংরক্ষণ ও বিলোপ, আন্তর্জাতিক

Scroll to Top