ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থায় নতুন অগ্রগতি, কক্ষপথে এনভিএস-০৩ স্যাটেলাইট

শুক্রবার রাতে ভারতের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) হাজারো বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ জেগে থেকে অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন একটি অভিযান পরিচালনা করছিলেন। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে শ্রীহরিকোটা থেকে ইসরোর জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (জিএসএলভি-এফ১৮) আকাশে গর্জে ওঠে। রকেটটি বহন করছিল এনভিএস-০৩ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশন স্যাটেলাইট, যা ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ‘নাভিক’ (NavIC) পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

সফল এই অভিযান ছিল নিছক আরেকটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নয়। এটি ভারতের কৌশলগত অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণের পথে অগ্রগতি।

উৎক্ষেপণের কয়েক মিনিট পর ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন ঘোষণা করেন, স্যাটেলাইটটি ‘সফলভাবে এবং নিখুঁতভাবে নির্ধারিত উপবৃত্তাকার কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে’। অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত এখন ‘এক দেশ, এক সময়’ (One Nation, One Time) লক্ষ্য অর্জনের আরও কাছাকাছি যেতে পারবে। এ সময় তিনি নিজস্ব ও অত্যন্ত নির্ভুল সময় নির্ধারণ এবং নেভিগেশন পরিষেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

স্যাটেলাইটটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করায় ইসরোকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এই অভিযান আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা নাভিককে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। উন্নত সক্ষমতাসম্পন্ন এনভিএস-০৩ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেবে এবং জনগণের উপকারে আসা নেভিগেশন পরিষেবাগুলোকে সহায়তা করবে। আমাদের মহাকাশবিজ্ঞানীদের নিষ্ঠা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা ক্রমাগত দেশকে গর্বিত করে চলেছে।’

এনভিএস-০৩ ভারতের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিরিজের তৃতীয় স্যাটেলাইট এবং ভারতীয় আঞ্চলিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা (আইআরএনএসএস)-এর দ্বাদশ স্যাটেলাইট। এটি আইআরএনএসএস-১এল নামেও পরিচিত। এর প্রধান কাজ হলো বিদ্যমান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা নাভিকে নতুন সক্ষমতা, অধিক স্থিতিশীলতা ও উন্নত নির্ভরযোগ্যতা যুক্ত করা। নাভিককে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

এমন এক সময়ে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হলো, যখন ভারতের জন্য একটি স্বাধীন নেভিগেশন ব্যবস্থা থাকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাভিকের সূচনা ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে। ওই সময় ভারত গুরুত্বপূর্ণ জিপিএস তথ্য পেতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছিল বলে জানা যায়। সেই অভিজ্ঞতা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের বুঝিয়ে দেয়, বিদেশি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন সার্বভৌম নেভিগেশন সক্ষমতা দেশটির প্রয়োজন। এর ফলেই আইআরএনএসএস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, যা পরে ‘নাভিক’ বা ‘নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন’ নামে পরিচিতি পায়।

নাভিক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভারতের ভেতরে এবং দেশের সীমান্তের বাইরে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অত্যন্ত নির্ভুল অবস্থান নির্ণয়, নেভিগেশন ও সময় নির্ধারণের (পজিশনিং, নেভিগেশন অ্যান্ড টাইমিং) পরিষেবা দেওয়া যায়। এই ব্যবস্থা বেসামরিক ব্যবহারকারীদের জন্য স্ট্যান্ডার্ড পজিশনিং সার্ভিস এবং কৌশলগত ও অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জন্য রেস্ট্রিক্টেড সার্ভিস দিয়ে থাকে।

বর্তমানে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটি এল৫ ও এস ব্যান্ডে প্রেরিত নেভিগেশন সংকেতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের স্যাটেলাইটগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত এল১ সংকেত যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে স্মার্টফোন, পরিবহন, বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক খাতে ব্যবস্থাটির ব্যবহারযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তবে ভারতের নেভিগেশন কর্মসূচি বড় মহাকাশ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম কঠিন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।

এ পর্যন্ত ১১টি নেভিগেশন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হলেও কয়েকটিতে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আমদানি করা পারমাণবিক ঘড়ির সমস্যার কারণে এসব ত্রুটি হয়েছে। বছরের পর বছর একাধিক স্যাটেলাইট আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে, ফলে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কটির কার্যকারিতা কমে যায়। একপর্যায়ে সাতটি সচল স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করে পরিচালনার জন্য তৈরি ব্যবস্থাটি হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবহারযোগ্য স্যাটেলাইট দিয়ে চলছিল।

পারমাণবিক ঘড়ি যেকোনো নেভিগেশন স্যাটেলাইটের মূল অংশ। এগুলো অত্যন্ত নির্ভুল সময়ের তথ্য সরবরাহ করে, যার সাহায্যে পৃথিবীর পৃষ্ঠে থাকা ব্যবহারকারীরা নিজেদের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারেন। সময়ের হিসাবে সামান্য ত্রুটিও নেভিগেশনে বড় ধরনের অসংগতি তৈরি করতে পারে। আইআরএনএসএসের কয়েকটি স্যাটেলাইটে পারমাণবিক ঘড়ির ব্যর্থতা কর্মসূচিটিকে বড় ধাক্কা দেয় এবং ইসরোকে কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।

এর জবাবে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়। এনভিএস-০৩-এ সংগ্রহ করা ঘড়ির পাশাপাশি একটি ভারতীয় পারমাণবিক ঘড়িও রয়েছে। নিজস্ব এই ঘড়ি একটি বড় প্রযুক্তিগত মাইলফলক। কারণ, নেভিগেশন স্যাটেলাইটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে ভারত।

এনভিএস-০৩-এর সফল উৎক্ষেপণ আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতের কৌশলগত চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

অপারেশন সিঁদুর চলাকালে জাতীয় প্রয়োজন মেটাতে ইসরো তাদের ৫০টিরও বেশি স্যাটেলাইটের প্রায় পুরো বহরকে কাজে লাগায়। সহায়তার জন্য পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট, যোগাযোগ স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য মহাকাশ সম্পদ ব্যবহার করা হয়। তবে সম্পূর্ণ কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ নাভিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি ভারতের কৌশলগত কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হিসেবে রয়ে যায়।

ভারতের মতো আয়তন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন একটি দেশের জন্য নিজস্ব নেভিগেশন সক্ষমতা এখন আর বিলাসিতা নয়। এটি সামরিক ও জাতীয় অবকাঠামোর অপরিহার্য অংশ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বলেছেন, অপারেশন সিঁদুর চলমান রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাতটি স্যাটেলাইট নিয়ে একটি শক্তিশালী নাভিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। এনভিএস-০৩ কক্ষপথে পৌঁছানোর ফলে নেটওয়ার্কটির সক্ষমতা আরও বাড়ল। কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে চারটি নেভিগেশন স্যাটেলাইট এই নেটওয়ার্ককে সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো সাতটি স্যাটেলাইট নিয়ে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

এ কারণেই নেটওয়ার্কটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক করতে ইসরো আগামী সময়ে এনভিএস-০৪ ও এনভিএস-০৫ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে।

উৎক্ষেপণযানটির পারফরম্যান্সও ছিল সমানভাবে উল্লেখযোগ্য।

একসময় জিএসএলভি মার্ক-২-কে ইসরোর ‘দুষ্টু ছেলে’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশেষ করে ক্রায়োজেনিক প্রপালশন প্রযুক্তি নিয়ে ব্যর্থতা ও নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের ইতিহাসের কারণে রকেটটির এমন পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। বছরের পর বছর রকেটটি অনিশ্চিত পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত ছিল। এর ২০টি উৎক্ষেপণের মধ্যে ছয়টি ব্যর্থ হয়েছে। আজকের উৎক্ষেপণ সম্পর্কে নারায়ণন বলেন, ‘এটি বিশ্বের যেকোনো রকেটের সবচেয়ে নিখুঁত উৎক্ষেপণ ছিল।’

তবে অধ্যবসায় ও প্রকৌশলগত উন্নয়নের মাধ্যমে উৎক্ষেপণযানটির সক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে রকেটকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হতো, মহাকাশবিষয়ক মহলে এখন সেটিকে ক্রমেই ইসরোর ‘বুদ্ধিমান ছেলে’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই উৎক্ষেপণযান ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। সম্প্রতি এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের যুগান্তকারী পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট নিসারও (NISAR) উৎক্ষেপণ করেছে।

প্রায় ৫০ মিটার উঁচু এবং উৎক্ষেপণের সময় প্রায় ৪২০ টন ওজনের তিন ধাপের এই রকেট আবারও তার পরিপক্বতা প্রমাণ করেছে। এটি এনভিএস-০৩-কে নির্ধারিত ট্রান্সফার কক্ষপথে নিখুঁতভাবে স্থাপন করেছে।

ইসরোর জন্য এই অভিযানের বাড়তি তাৎপর্য রয়েছে। ২০২৬ সালে সংস্থাটির এটি তৃতীয় উৎক্ষেপণ। বছরটিতে ইতোমধ্যে সাফল্য ও হতাশা, দুই অভিজ্ঞতাই এসেছে। ফলে এনভিএস-০৩ অভিযানটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মহাকাশে কৌশলগত সক্ষমতা গড়ে তোলার ব্যাপারে ভারত যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এই উৎক্ষেপণ সেই বার্তাই দিচ্ছে।

দেশ যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন ইসরো নীরবে মধ্যরাতে জাতিকে একটি উপহার দিয়েছে। শক্তিশালী করেছে এমন একটি নেভিগেশন নেটওয়ার্ক, যার জন্ম কারগিল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে, যা বাস্তব পরিচালনাগত পরিস্থিতিতে পরীক্ষিত হয়েছে এবং এখন ভবিষ্যতের জন্য পুনর্গঠিত হচ্ছে। এনভিএস-০৩ একাই নাভিককে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। তবে ভারতের জরুরি প্রয়োজনীয় একটি পূর্ণাঙ্গ নিজস্ব নেভিগেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আপাতত ইসরোর ‘বুদ্ধিমান ছেলে’ তার দায়িত্ব পালন করেছে। আর ভারত প্রকৃত নেভিগেশন স্বাধীনতা এবং ‘এক দেশ, এক সময়’ লক্ষ্য অর্জনের আরও এক ধাপ কাছাকাছি পৌঁছেছে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

সৈয়দপুরে ইমপ্যাক্ট প্রকল্পের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট পরিদর্শন করলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সৈয়দপুর

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় ইমপ্যাক্ট (ফেজ-৩) প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট

Scroll to Top