সিলেটের লাখো মানুষের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম পাথর কোয়ারিগুলো প্রায় ৮ বছরের অথিক সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকায় গোয়াইনঘাট উপজেলার ব্যবসায়ী ও সাধারণ শ্রমিকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তাঁরা। কয়েক বছর ধরে মানুষের কর্মসংস্থানের পথ পাথর কোয়ারিগুলো বন্ধ থাকার ফলে এখানকার অর্থনৈতিক অবস্থায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
শ্রমিকরা জানান, আগে প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাতে পারলেও এখন তারা বেকার জীবনযাপন করছেন।
বিশেষ করে গেল ঈদুল ফিতরেও কাজের কোনো সুযোগ না থাকায় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ঈদের আনন্দ ছিল অনেকটাই ম্লান। অনেক পরিবার স্বাভাবিকভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারেননি। নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেও হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
অন্যদিকে, পাথর ব্যবসার সাথে জড়িত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বড় ধরনের লোকসানে। পাথর, বালু পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংক ঋণ ও দেনার চাপে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল বলছেন, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় এ অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা দ্রুত একটি টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এলাকাবাসী বলেন, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে বালু-পাথর উত্তোলন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে যেমন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিও আবার সচল হয়ে উঠবে।
জাফলং, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, লোভাছড়া, শ্রীপুরসহ পাথর কোয়ারি থেকে বালু-পাথর উত্তোলন, সংগ্রহ ও সরবরাহ করে অত্রাঞ্চলসহ দেশের প্রায় কয়েক লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এগুলো বন্ধ থাকার ফলে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছেন। একই সাথে বেকার হয়ে পড়েছে প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক। বর্তমানে ওই শ্রমিকগুলো অনাহারে আর অর্ধাহারে দিনযাপন করছে।
দীর্ঘদিন থেকে পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় পরিবহন খাত থেকে শুরু করে পাথর লোড-আনলোডের সাথে জড়িত বেলচা ও বারকি শ্রমিক, ট্রাক-ট্রাক্টর ও স্টোন ক্রাশার শ্রমিকদের মাঝেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ ট্রাক মালিক ব্যাংক ঋণ, আবার কেউ কেউ কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের শর্তে গাড়ী কিনছিলেন। কিন্তু কোয়ারি বন্ধ থাকার ফলে ট্রাক মালিকরা কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘ ৮ বছরেরও অধিক সময় ধরে পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় বেকারত্ব যেন দিনদিন বেড়ে চলছে। আর অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। হতাশা যেন পিছু ছাড়ছেনা না তাঁদের। ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋন মাথায় নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ছেন।
এছাড়াও কর্মসংস্থান না থাকায় অনেকে বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। দ্রুত পাথর কোয়ারি খুলে দিলে চোরাচালানও অনেকটাই কমে আসবে বলে আশাবাদী।
একাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন থেকে পাথর কোয়ারী খুলে দেয়ার দাবিতে তারা মানববন্ধন, হরতাল, অবরোধ, পরিবহন ধর্মঘট, সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই লক্ষাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে বর্তমান সরকারের প্রতি জোড়ালো আহ্বান জানান তারা।
বালু ব্যবসায়ী হারুন মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন থেকে কোয়ারি বন্ধের ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছি। ব্যাংক থেকে ঋন নিয়ে পরিশোধ করতে না পেরে এখন জরাজীর্ণ অবস্থা।
বল্লাঘাট বার্কি ও বালু চিপ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলু জানান, দীর্ঘদিন থেকে পাথর কোয়ারী বন্ধ থাকায় আমাদের খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কষ্ট আর যন্ত্রনা দেখার কেউ নেই। মানবেতর জীবন যাপন করছে সিলেটের সবকটি পাথর কোয়ারীর খেটে খাওয়া লাখ লাখ শ্রমিক।
আশা করবো বর্তমান সরকার শ্রমিকদের কথা বিবেচনায় এনে সনাতন পদ্ধতিতে আবারও সবকটি পাথর কোয়ারী খুলে দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন।
এদিকে, পাথর কোয়ারি সমুহের উৎসমুখের পাথর অপসারণ না করায় প্রতি বছর ভারতের ঢলে নতুন করে পাথরের স্তুপ জমছে। দিন দিন বেড়ে চলেছে উজান থেকে নেমে আসা এসব পাথরের স্তুপ। এতে করে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে নদ নদীর সাধারণ পানি প্রবাহে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। এতে করে স্থানীয় এসব নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে।
জাফলং বালু ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় সবকটি কোয়ারিতে বহুগুণ বেড়েছে পাথরের পরিমাণ। এতে শ্রমিকদের কস্ট যেন দেখার কেউ নাই। আশা করবো খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেয়া হোক।
জানা যায়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবীদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোয় যন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন উচ্চ আদালত। তবে অপরিকল্পিতভাবে ও যন্ত্রের সাহায্যে পাথর তোলা অব্যাহত থাকায় ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরেফিন টিলা, বিছনাকান্দি ও লোভছড়া কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।