‘কেবল মুখস্থ বিদ্যা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়, দেশ রক্ষায় ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় প্রয়োজন’

 


বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ড কিংবা আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো ঘটনা বারবার ঘটছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজিপুর, টঙ্গি, সাভার, কুষ্টিয়া, জামালপুর, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ ও শিক্ষক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার প্রত্যাশায় অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠালেও সেখানে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্স’ (জেএমবিএফ)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২ থেকে ৭৫টি ঘটনায় ১০৯ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পুরো দেশে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ১৩১টি ঘটনায় মোট ১৭১ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে।বিচারের সংকটে মামলা হলেও আইনি দুর্বলতা ও প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে অধিকাংশ ঘটনার বিচার হচ্ছে না।

জেএমবিএফের তথ্য অনুযায়ী মাদ্রাসার ধরন বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বা সুনির্দিষ্ট বিভাজন তাদের প্রতিবেদনে করা হয়নি, তবে দেশে বেশির ভাগ মাদ্রাসাই আলিয়া মাদ্রাসা জামায়াত ইসলামী আর কওমি ঘরানার দেওবন্দী ও হেফাজতে ইসলাম পন্থীদলগুলোর প্রভাবাধীন মাদ্রাসার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সংখ্যার বিচারে অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রভাব মূলত সরকারি ও এমপিওভুক্তআলিয়া মাদ্রাসাধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। তবে কোনো মাদ্রাসাই আইনি বা দাপ্তরিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের “নিজস্ব মাদ্রাসা” হিসেবে নিবন্ধিত নয়।

এদিকে, লোকলজ্জার ভয়ে ছেলে শিশুদের ওপর সংঘটিত বহু অপরাধ এখনও আড়ালে থেকে যায়। ফলে ভুক্তভোগী শিশুরা প্রয়োজনীয় শারীরিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মী এবং শিশু সুরক্ষা বিশ্লেষকদের সুপারিশ অনুযায়ী এর স্থায়ী ও নিরাপদ সমাধান দিতে গিয়ে বলেন, মামলা ও আইনি সুরক্ষায়মামলা দায়ের হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অধরা থাকার বিষয়টি সত্য। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মেডিকেল টেস্ট, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুতের জন্য আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট এসওপি (Standard Operating Procedure) বা নির্দেশনার অভাব রয়েছে। এর ফলে অনেক সময় আদালতে যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পরিবার আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না।

মাদ্রাসায় শিশুদের ভর্তি করানোর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষার মান ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ব সুন্নী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের নিবন্ধিত মানবতার একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আল্লামা ইমাম হায়াত।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, শিশুদের এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা উচিত নয়, যেখানে তাদের নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত নয়। তিনি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আল্লামা ইমাম হায়াতের অভিযোগ, কিছু মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও নানা ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটে থাকে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, নিয়মিত তদারকি এবং অভিভাবকদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, কেবল ধর্মীয় গ্রন্থের কিছু অংশ মুখস্থ করলেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা অর্জিত হয় না। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।

মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন, বলাৎকার এবং শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে একটি বহুমুখী ও সমন্বিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোগড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন:ডিএনএ এবং মেডিকেল পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল প্রমাণগুলো যাতে আদালতে গ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নাতীতভাবে উপস্থাপন করা যায়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাকর্মী ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া। মাদ্রাসার আবাসিক কক্ষ, বারান্দা এবং প্রবেশপথগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা এবং এর ফুটেজ নিয়মিত স্থানীয় প্রশাসন বা গভর্নিং বডি দ্বারা অডিট করা।

যৌন সচেতনতা শিক্ষা অনুযায়ী শিশুদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ (নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ) সম্পর্কে সচেতন করা, যেন তারা যেকোনো অস্বাভাবিক আচরণ বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বা অভিভাবককে জানাতে পারে। মাদ্রাসার ভেতরে এমন ব্যবস্থা রাখা যাতে শিশুরা কোনো ভয় বা দ্বিধা ছাড়া সরাসরি মাদ্রাসা কমিটি, অভিভাবক বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ (যেমন: সরকারি হেল্পলাইন ১০৯ বা ৯৯৯) পৌঁছাতে পারে।

 

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

‘কেবল মুখস্থ বিদ্যা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়, দেশ রক্ষায় ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় প্রয়োজন’

  বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ড

সাঈদী রাজাকার ছিলেন না, দাবি মানিক পশারীর ভাইয়ের বোনের ভাষায় ‘সাঈদী আল্লাহর ওলি’, আরেক বোনের দাবি, ‘আমরা সবাই আওয়ামী লীগ’

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী প্রয়াত

Scroll to Top