একটি সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা ফাতেমা বেগম। শ্রেণি ও মানবিকতার সীমারেখা রাজনীতির ইতিহাস সাধারণত ক্ষমতার পালাবদল, সংঘাত আর কৌশলের দলিল হয়ে থাকে। কিন্তু সেই ইতিহাসের ফাঁকফোকরেই কখনো কখনো জন্ম নেয় এমন কিছু মহান্বিত সম্পর্ক ও আত্মার বন্ধন, যা ক্ষমতার ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। শুধু মানবিকতার মানদন্ডে বোঝা যায়। ফাতেমা বেগমের গল্প তেমনই এক সম্পর্কের বয়ান। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নীরব সঙ্গী। আলোচনার বাইরে থাকা এই নারী কেবল একজন গৃহকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; সময়ের প্রয়োজনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নির্ভরতা, সাহস ও সহমর্মিতার প্রতীক। পতিত সৈরাচারের দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত জনাব তারেক রহমান যখন পরিবারসহ লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, তখন ঢাকায় বেগম খালেদা জিয়ার দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন ফাতেমা বেগম। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, শারীরিক অসুস্থতা ও একাকিত্বের সময়ে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৮ সালে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। সেই সময় পতিত সৈরাচারের দোসরদের রক্তচক্ষু, রোশানল এবং নানাবিধ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, কুটকৌশল, হয়রানী ও প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবারের কেউ সরাসরি তাঁর পাশে থাকার মত পরিস্থিতি ছিলনা । ঠিক তখনই ফাতেমা বেগম একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন এবং আদালতে আবেদন করেন যে, স্বেচ্ছায় কারাগারে গিয়ে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার সেবা করতে চান। আদালত এই নজিরবিহীন আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে অনুমতি দেয়। ফলশ্রুতিতে ফাতেমা বেগম প্রায় ২৫ মাস অর্থাৎ ৭৭৮ দিন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাবন্দি অবস্থায় থাকেন। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। যেখানে দায়িত্ববোধ ও মমত্ববোধ আত্মীয়তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সময়ের প্রবাহে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান ঘটেছে। কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও অশ্রুশিক্ত হয়ে তিনি চিরস্থায়ী বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু, তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতা ও সংগ্রামের যে অধ্যায়, সেখানে ফাতেমা বেগম ছিলেন নীরব প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোদ্ধা। এই অনুভব থেকেই জন্ম নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী পারিবারিক সিদ্ধান্ত। জনাব তারেক রহমান ফাতেমা বেগমকে আইনিভাবে দত্তক নিয়ে তাঁকে বোনের মর্যাদা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ফাতেমা আর কেবল একজন গৃহকর্মী নন বরং তাঁকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও আপোসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কন্যা এবং জনাব তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর বোন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন তিনি। এমন মহানুভবতা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। দেশবাসীর কাছে ফাতেমা বেগম এখন জিয়া পরিবারের একজন সম্মানিত সদস্য ও একজন বোন হিসেবে সম্মানিত হবেন। এই ঘটনাকে অনেকেই দেখছেন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব হিসেবে। যেখানে পরিচয় নির্ধারিত হয়েছে কাজ দিয়ে নয় বরং ত্যাগ ও দায়িত্ববোধ দিয়ে। এটি কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা নয় বরং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক শক্তিশালী স্মারক। এযেন রাজনীতির কোলাহলে দাঁড়িয়ে বলা এক সরল সত্য। ক্ষমতার চেয়েও বড় কিছু আছে, আর তা হলো মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, আত্মার বন্ধন ও মহামান্বিত মর্যাদা।