বরাদ্দ ১৩ কোটি, দুই বছরেও শেষ হয়নি ১১ কিমি সড়কের কাজ, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-আখাউড়া সড়কের ১১ কিলোমিটার অংশ উন্নয়ন ও কার্পেটিংয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের জুনে শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। উল্টো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। এদিকে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই উপজেলার হাজারো মানুষ। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী, চালক, শিক্ষার্থী, রোগী ও কর্মজীবীরা।

সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনকে। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে গর্তে পড়ে যানবাহনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ায় বাড়ছে চালকদের মেরামত খরচ।

সড়কটি ব্যবহারকারী মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। প্রতিদিন এ পথে যাতায়াত করতে গিয়ে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং কর্মজীবী মানুষের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

সিএনজিচালক শফিক বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন গাড়ি চালাতে হয়। রাস্তার যে অবস্থা, তাতে গাড়ি চালানো খুবই কষ্টকর। গর্তে পড়ে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। মেরামতে বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে। যাত্রীদের নিয়েও ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করতে হয়। দ্রুত রাস্তাটি সংস্কার করা হলে আমাদের কষ্ট অনেকটা কমবে।’

নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী লোকমান বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও বড় গর্ত, কোথাও পিচ উঠে গেছে। বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমে থাকায় বোঝা যায় না কতটা গভীর। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চলছে। দ্রুত কাজ শেষ করে আমাদের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই।’

কসবা থেকে আখাউড়া পর্যন্ত যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এ সড়ক। দুই উপজেলার মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ উন্নয়নকাজ চললেও সড়কের বেহাল দশা কাটছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব স্থানে কাজ চলছে, সেখানেও অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। কোথাও কোথাও নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু কাজের মেয়াদ বাড়ানো নয়, দ্রুত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘রুরাল কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় সড়কটির ১১ কিলোমিটার অংশ উন্নয়ন ও কার্পেটিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কাজটি পেয়েছে কিশোরগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমিনুল হক। ২০২৪ সালের জুনে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে।

কাজের বিলম্বের কারণ হিসেবে বৃষ্টিকে উল্লেখ করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি খায়রুল হাসান। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা হবে।’

তবে কাজের ধীরগতিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আখাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. আমিনুল ইসলাম সুমন বলেন, কাজের ধীরগতির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও কেন নির্ধারিত সময়ে সড়কের কাজ শেষ হলো না? আর কত দিন দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করতে হবে তাঁদের? তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কাজের গতি বাড়াবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সড়কটির উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করবে।

স্থানীয়দের মতে, কসবা-আখাউড়া সড়কটি শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়, দুই উপজেলার হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করা, নির্মাণের মান নিশ্চিত করা এবং চলাচলের নিরাপত্তা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন সড়কটি ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ।

 

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top