যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও অতিরিক্ত উৎপাদন: চীনের সঙ্গে বিরোধে কঠোর ইউরোপ

গত এক বছর বা তার কিছু বেশি সময়ে ইউরোপ ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রায় পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থাকলেও এখন তা তিক্ততা ও বৈরিতায় রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তন আকস্মিক নয়। বরং আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর সম্পর্কহীন কয়েকটি ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা একদিকে ইউরোপকে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে, অন্যদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় ইউরোপকে এমন কিছু প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে, যা আগে তাদের হাতে ছিল না।

সম্প্রতি পর্যন্ত ইউরোপীয় ও চীনা উভয় পক্ষই বিদ্যমান বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট ছিল। চীনের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। অন্যদিকে ইউরোপীয় ভোক্তারাও তুলনামূলক আকর্ষণীয় দামে চীনা পণ্যের অবাধ সরবরাহকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বাণিজ্য ভারসাম্য ইউরোপের বিপক্ষে থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল।

মাঝেমধ্যে ইউরোপীয়রা চীনা সরকারের রপ্তানিকারকদের ভর্তুকি দেওয়া এবং অন্যান্য আপত্তিকর বাণিজ্যিক চর্চার বিষয়ে অভিযোগ তুলতেন। তবে এসব অভিযোগের তীব্রতা ও ভাষার কঠোরতা ওয়াশিংটনের অভিযোগের ধারেকাছেও ছিল না। চীনে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা করা ইউরোপীয় শিল্পোদ্যোক্তারা এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আলোচকদের বিরত রাখতেন, যাতে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

বিশেষ করে চারটি ঘটনার কারণে এই তুলনামূলক সন্তোষজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। তথাকথিত ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানোর বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা চীনে ইউরোপীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সফলভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করে। একই সময়ে ওই কর্মসূচির আওতায় বেইজিংয়ের বিনিয়োগ চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাহিদাকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় চীনা উৎপাদকদের পণ্য বিক্রির জন্য বিদেশের বাজারের দিকে বেশি ঝুঁকতে হয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের শাসনামলে এবং পরে আবার ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর চীনা বাণিজ্যের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী মনোভাব দেশটির মার্কিন বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা সংকুচিত করে। ফলে চীন তার পণ্য বিক্রির জন্য ইউরোপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর মাধ্যমে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও হুমকির মুখে পড়ে।

এর গভীর প্রভাব পড়ে চীনে একসময় অত্যন্ত লাভজনক ইউরোপীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। ইউরোপের উন্নত যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল পণ্যের বিক্রিতে একসময় যে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি ছিল, তা হঠাৎ করেই থমকে যায়। ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা ব্র্যান্ডগুলোর পরিস্থিতি এই সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনে মার্সিডিজ গাড়ির বিক্রি প্রতিবছর ২৪ শতাংশ হারে বেড়েছিল। একই সময়ে বিএমডব্লিউর বিক্রি বেড়েছিল বছরে ২০ দশমিক ২ শতাংশ এবং অডির বিক্রি বেড়েছিল ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে। কিন্তু মাত্র গত এক বছরে চীনা প্রতিযোগীরা বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করায় এই প্রবণতা উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে।

এসব গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একই সময়সূচি অনুযায়ী বিক্রির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তবে যেসব পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তাতে পরিবর্তনের চিত্র যথেষ্ট স্পষ্ট। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি আগের ১২ মাসের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১২ মাসে চীনে বিএমডব্লিউর বিক্রি কমেছে ২৫ শতাংশ। আর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত অডির বিক্রি কমেছে ১২ শতাংশ। ইউরোপীয় শিল্পের এসব শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কাছে এখন চীনা বাণিজ্যিক চর্চার বিষয়ে ইইউর আনুষ্ঠানিক সমালোচনা সংযত রাখার কোনো কারণ অবশিষ্ট ছিল না।

চীনা পণ্য যখন নিজ দেশের বাজারেই ইউরোপীয় পণ্যকে পেছনে ফেলতে শুরু করে, তখন ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ কর্মসূচির মাধ্যমে বেইজিংয়ের গড়ে তোলা উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়। এমনিতেই দেশটির আবাসন খাতের সংকটের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গিয়েছিল।

নতুন করে সম্প্রসারিত উৎপাদন সক্ষমতার ফলে এত বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি হতে থাকে যে, অভ্যন্তরীণ বাজারে তা শোষণ করার সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। এতে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে উৎপাদক পর্যায়ের পণ্যমূল্য কমে যায়। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি থেকে মুনাফা অর্জনের সুযোগও সংকুচিত হয়। ২০২৫ সালের পুরো সময় এবং চলতি বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রতি মাসেই পণ্যমূল্য কমেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উৎপাদক মূল্যসূচক কেবল তখনই বেড়েছে, যখন পারস্য উপসাগরে সংঘাতের কারণে আমদানি করা জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা চীনা উৎপাদকরা মরিয়া হয়ে বিদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির চেষ্টা শুরু করেন। ঠিক সেই সময় ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের বাজারসুবিধা প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। চলতি বছর এখন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির গতিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে, এমন বাজারের জন্য চীনের সামনে ইউরোপ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। এর প্রভাবও দ্রুত দৃশ্যমান হয়। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চীন থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালেও এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হওয়া ১২ মাসে চীন থেকে ইইউর পণ্য আমদানি আরও ৮ শতাংশ বেড়েছে।

চীনের বাজারে চীনা প্রতিযোগিতার কারণে ইউরোপীয় পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে ইউরোপে চীনা পণ্যের নতুন করে ব্যাপক প্রবেশের ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি সামাল দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬৬ বিলিয়ন ইউরো। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৩ বিলিয়ন ইউরোতে। দুই বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এই প্রবণতা ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ‘ভিত্তি’ মধ্যম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্স একটি সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। উসকানিমূলক শিরোনাম ‘দ্য চাইনিজ স্টিমরোলার’ বা ‘চীনা রোলার’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে চীনা আমদানিকে ইউরোপের সমৃদ্ধির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

একসময় চীনকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। তবে এবার দেশ দুটি একই অবস্থানে এসেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ফরাসি সরকারের ওই প্রতিবেদনে প্রকাশিত উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করেছেন। চীনা সরকারের ভর্তুকি এবং রপ্তানিকারকদের আর্থিক সহায়তার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ তুলে ইউরোপীয়রা ক্রমেই অতীতের মার্কিন কর্মকর্তাদের মতো বক্তব্য দিতে শুরু করেন।

তবে অতীতের তুলনায় এবার বেইজিংয়ের ওপর ইউরোপের কিছুটা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন শুল্কের কারণে ইউরোপ ছাড়া চীনের সামনে বিকল্প বাজার খুব বেশি না থাকায় বাণিজ্যসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বেইজিং আগের মতো অবজ্ঞাপূর্ণ অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

অতীতে ইইউর বাণিজ্য আলোচকেরা চীনা সরকারের বাণিজ্যিক চর্চা নিয়ে অভিযোগ তুললে বেইজিং তাদের বিরুদ্ধে আইনবহির্ভূত আচরণের অভিযোগ আনত, পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিত। সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে চীনা নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি ইউরোপীয় পণ্য কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিত।

কিন্তু চলতি বছর বেইজিংয়ের অবস্থান অনেক বেশি নমনীয় হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ওপর শুল্ক আরোপ করলে বেইজিং অনেকটা নীরবে ইউরোপে প্লাগ-ইন ও হাইব্রিড গাড়ি রপ্তানির পরিমাণ বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই রপ্তানি বছরে মাত্র ৬ শতাংশ হারে বাড়ানোর বিষয়েও সম্মতি দেয়।

এটি এমন পদক্ষেপের একটি উদাহরণ মাত্র। ইইউর বিভিন্ন মহলে বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানির ওপর আরোপিত সীমার মতো রাসায়নিক পণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমা আরোপের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে চীনের বাইরেও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে ইইউ ‘বৈচিত্র্যকরণ উপকরণ’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করছে। এসব পদক্ষেপের বিষয়ে বেইজিং এখন পর্যন্ত কোনো সমালোচনা করেনি।

মনে হচ্ছে, ট্রাম্প অনিচ্ছাকৃতভাবেই ইউরোপীয়দের হাতে এমন একটি হাতিয়ার তুলে দিয়েছেন, যার সাহায্যে তারা বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে।

প্যারিসভিত্তিক জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এলভির ফ্যাব্রির ভাষায়, ইউরোপীয়রা ভালোভাবেই জানেন, তাদের সামনে ‘সুযোগের জানালা খুবই ছোট’। তবে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকতেই ইউরোপীয়রা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে বেইজিংয়ে চীনের নেতৃত্ব হয়তো মনে করছে, তারা নিজেদের অবস্থান অতিরিক্ত জোরালোভাবে তুলে ধরে কিছুটা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top