প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চট্টগ্রামে প্রথম সফর নিয়ে বেশ ইতিবাচক আলোচনা চলছে। তাঁর এই সফরে কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা কিংবা উদ্বোধনের মাধ্যমে শেষ করার কোনো কর্মসূচি ছিল না। এরপরও সফরটি ঘিরে চট্টগ্রামে উজ্জীবিত বিএনপির নেতাকর্মীরা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহারে ‘মুগ্ধ’ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরাও।
ফটিকছড়িতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের আমির শাহ আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এটি ছিল তাঁর এই সফরের বড় একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এটিকে হেফাজতের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন হিসেবে দেখছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। দাবি-দাওয়া আদায়ে এই সম্পর্ককে কাজে লাগাতে চান তারা।
হেফাজতে ইসলাম সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই হেফাজতের নেতাকর্মীরা মূলত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। মামলা-মোকদ্দমা ও ধরপাকড় থেকে রেহাই পেতে সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভিড়েছিলেন। বড় অংশটি নীরব অবস্থানে ছিলেন। একপর্যায়ে তারাই প্রকাশ্যে বিএনপিকে সমর্থন দেন। গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে কোণঠাসা নেতাকর্মীরা ঘুরে দাঁড়ান। বিপরীতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়া হেফাজতের নেতাকর্মীরা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এসব নেতাকর্মীকে ফেরানোর কথা ভাবছেন সংগঠনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।
এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের নায়েব আমির মুফতি লোকমান হাকিম অবশ্য বলেন, হেফাজতের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। সারাদেশের হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশ পরিচালনায় সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। হেফাজত যেহেতু একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যেহেতু বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংগঠনের আমিরের একটা সুসম্পর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। হেফাজতের নেতাকর্মীরা এটিকে সংগঠনের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। হেফাজতের যারা নিস্ক্রিয় তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা হবে।
এদিকে বিএনপি সরকারের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও দাবি-দাওয়া আদায় করতে চাইছেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এজন্য সরকারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে একটি টিমও গঠন করা হচ্ছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৯টি দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। ক্রমান্বয়ে এসব দাবি আদায়ে পরিকল্পনা করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কিছু প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরা হয়েছে। হেফাজত আশা করে, সরকারপ্রধান এসব দাবিকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করবেন।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের শীর্ষ আলেমদের এ ধরনের সৌজন্য সাক্ষাৎ পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামবিদ্বেষী কোনো শক্তি যাতে অনৈক্য সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও সরকার নিশ্চয় পদক্ষেপ নেবে বলে হেফাজতের নেতাকর্মীরা আশা করেন।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুফতি হাবিবুর রহমান কাসেমী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আলেম-ওলামাদের বৈঠকের পর সারাদেশের হেফাজতে ইসলামের নেতারা খুবই উচ্ছ্বসিত। সরকারের এই সমর্থন কাজে লাগিয়ে হেফাজতের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হবে এবং দাবি-দাওয়াগুলো আলোচনার মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা করা হবে।
গত রোববার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ব্যস্ততম সময় পার করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকালে প্রথমেই ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে কক্সবাজারের মহেশখালী গিয়ে মাতাবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পরিদর্শন করেন তিনি। এরপর সেখান থেকে হেলিকপ্টারেই চট্টগ্রামের বাঁশখালী যান। সেখানে বন্যায় গৃহহারা ১০০ পরিবারকে ঘর উপহার দেন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। সেখান থেকে আবার হেলিকপ্টারে ফটিকছড়িতে গিয়ে হেফাজতের আমির শাহ আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এরপর গাড়িতে হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন। রাতে নগরীতে হোটেল র্যাডিসনে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাদের নিয়ে দলীয় বৈঠক করেন।