মোঃ সাঈদ হাসান (সুজন)
সাতক্ষীরা: ‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে / সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে’— মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই অমর পঙক্তিমালা আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হয়। কিন্তু যে নদকে নিয়ে কবির এই কালজয়ী আবেগ, সেই কপোতাক্ষ নদ আজ তার চিরচেনা রূপ হারিয়ে মৃতপ্রায়। দখল, দূষণ আর পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই নদটি এখন কেবলই এক সংকীর্ণ খালে পরিণত হতে চলেছে।
এক সময় কপোতাক্ষের বুক চিরে চলত বড় বড় পণ্যবাহী নৌকা ও স্টিমার। এই নদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু সময়ের আবর্তে আর অযত্ন-অবহেলায় নদের সেই উত্তাল স্রোত এখন ইতিহাস। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে যেমন দেখা দেয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে নদের অনেক অংশ শুকিয়ে খেলার মাঠে পরিণত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদের দুই তীরে প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলদারিত্ব দিন দিন বাড়ছে। কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নদের গলা টিপে ধরা হচ্ছে। এছাড়া কলকারখানার বর্জ্য ও প্লাস্টিক সরাসরি নদে ফেলার কারণে পানি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কপোতাক্ষের এই মুমূর্ষু অবস্থার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যজীবীদের ওপর। সেচ কাজের জন্য পানির অভাব এবং নদে মাছ না থাকায় হাজার হাজার পরিবার আজ দিশেহারা। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাইলের পর মাইল এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসে।
”কপোতাক্ষ আমাদের অস্তিত্বের অংশ। এই নদ মরে যাওয়া মানে আমাদের ইতিহাস এবং পরিবেশের অপমৃত্যু। একে বাঁচাতে হলে দ্রুত খনন এবং দখলমুক্ত করা জরুরি।” — স্থানীয় একজন প্রবীণ অধিবাসী।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মহাকবির স্মৃতি রক্ষার্থে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কপোতাক্ষ নদকে পুনরায় প্রাণবন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিত ড্রেজিং এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদই পারে এই ঐতিহ্যবাহী নদকে পুনর্জন্ম দিতে।
কপোতাক্ষ আবার ফিরে পাক তার হারানো যৌবন, কবির কবিতার মতোই কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলুক নিরন্তর— এটাই এখন সাতক্ষীরাবাসীর প্রাণের দাবি।