হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলায় কৃষি খাতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। খরা, তীব্র শীত ও রোগ, পোকামাকড়ের মতো জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এই স্টেশনটি স্থানীয় কৃষির বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় “নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি)” প্রকল্পের আওতায় মাত্র আটজন জনবল নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে এবং বর্তমানে স্টেশনটির সকল কার্যক্রম “এলএসটিডি” প্রকল্পের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় কৃষকদের সমস্যার সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্টেশনটি জলবায়ু উপযোগী ধানের জাতের সফল অভিযোজন নিশ্চিত করেছে। ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক জাত সমূহ কৃষকদের কাছে জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে কার্যালয় টি এখন অবধি প্রায় ২৩৫ একরের বেশি জাত প্রযুক্তির প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে তিন শতাধিক কৃষকের মাঝে বিভিন্ন জাতের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত উফশী ধানের বীজ সরবরাহ করেছে বলে জানা যায়।
পঞ্চগড় জেলায় আধুনিক ধান উৎপাদন প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণের ফলে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই ফলন বৃদ্ধি ও শস্যের নিবিড়তা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আমন মৌসুমে খরা সহনশীল জাত ব্রি ধান৭১, স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত ব্রি ধান৭৫, উচ্চ ফলনশীল জাত ব্রি ধান১০৩ এবং স্থানীয় ভাবে প্রচলিত স্বর্ণা জাতের বিকল্প হিসেবে ব্রি ধান৯৩ ও ব্রি ধান৯৫ এর চাষ জনপ্রিয়করনের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, কম জীবনকাল সম্পন্ন জাত হওয়ায় ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান১০৩ চাষের ফলে অনেক কৃষক আগাম ফসল কর্তনের মাধ্যমে পরবর্তী ফসল হিসেবে আলু বা ভুট্টা আবাদ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে একই জমি থেকে বছরে অধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রি ধান১০৩ ও ব্রি ধান৯৩ চাষের ফলে উৎপাদন ঝুঁকি কমেছে এবং লাভের সম্ভাবনা বেড়েছে বলে কৃষকরা মনে করছেন। অপরদিকে, খরা সহনশীল ব্রি ধান৭১ তীব্র খরার মধ্যেও তুলনামূলক ভালো ফলন দেওয়ায় অনেক কৃষকের লোকসানের আশঙ্কা হ্রাস পেয়েছে। এদিকে বোরো মৌসুমে উন্নত ফলন নিশ্চিত করতে পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কৃষকের মাঝে ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান১০২ এবং প্রথমবারের মতো ব্রি হাইব্রিড ধান৮ জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে কৃষকেরা অধিক ফলন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে বীজ সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেওয়ায় কৃষকরা নিরাপদ ভাবে বীজ সংরক্ষণ করতে পারছেন এবং তা অন্য কৃষকদের মাঝেও বিতরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন।
জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার ধান চাষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, পঞ্চগড় নিরন্তর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্রি এর বিভিন্ন গবেষণা বিভাগ ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থাপনা, সার ব্যবস্থাপনা, পোকা মাকড় দমন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি সহ মোট ১১ টি গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো “ব্রি সিড জার্মিনেটর প্রযুক্তি”উদ্ভাবন শীর্ষক গবেষণা, যা বোরো মৌসুমে অতিরিক্ত শীত জনিত বীজ জার্মিনেশন সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও এলাকার উপযোগী শস্য বিন্যাস নির্বাচন ও জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যে ব্রি-এর রাইস ফার্মিং সিস্টেম বিভাগ পঞ্চগড় স্যাটেলাইট স্টেশনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। এর ধারাবাহিকতায় পঞ্চগড় সদর উপজেলার মৌলভিপাড়া গ্রামে কয়েকজন কৃষকের জমিতে “আমন (ব্রি ধান৭১)–আলু/ভুট্টা–আউশ/পাট” শস্য বিন্যাসের উপর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ব্রি-এর বিভিন্ন বিভাগ যেমন উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব বিভাগ, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং খামার যন্ত্রপাতি ও ফলনোত্তর প্রযুক্তি বিভাগ তাদের জাত ও প্রযুক্তির ট্রায়াল বাস্তবায়নে পঞ্চগড় স্যাটেলাইট স্টেশনের সহযোগিতা গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।
ধান পাকার পর অপচয় কমাতে সঠিক সময়ে ধান কর্তন, মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ বিষয়ে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় চার শতাধিক কৃষক ও কৃষাণীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
কৃষকের শ্রম ও সময় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ব্রি-এর যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের সহায়তায় রিপার ও সিড সোয়ার মেশিন সহ মোট ১০ টি যান্ত্রিক মূল্যায়ন সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য পঞ্চগড় সদর উপজেলার ঘাটিয়ারপাড়া প্রযুক্তি গ্রামে যান্ত্রিক ভাবে চারা