প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিয়োগ, তবু অভিজ্ঞতার শর্ত কেন?
সদ্য প্রকাশিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে শিক্ষকসমাজ ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে সরকারের এনটিআরসিএ দপ্তর। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঘোষণা থাকলেও, বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত শর্ত বা অগ্রাধিকারের বিষয়টি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এনটিআরসিএ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার, সহকারী সুপার, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি হবে ৮০ নম্বরের লিখিত (MCQ) পরীক্ষা ও ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে, যা সফটওয়্যারনির্ভর মেধাক্রম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, যেখানে নিয়োগ হবে জাতীয় পর্যায়ের কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে এবং মেধাই হবে প্রধান বিবেচ্য—সেখানে অভিজ্ঞতাকে অতিরিক্ত শর্ত বা অগ্রাধিকার হিসেবে যুক্ত করা নীতিগতভাবে সাংঘর্ষিক।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিক্ষক প্রার্থী ও এনটিআরসিএ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কর্মরত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলছেন—
“যদি অভিজ্ঞতাই মূল বিবেচ্য হয়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ের কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা আয়োজনের যৌক্তিকতা কোথায়?”
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি সাংবিধানিক সমতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করলে নতুন ও মেধাবী প্রার্থীরা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন বলে মত দেন তাঁরা।
একজন শিক্ষা প্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলেন,
“এনটিআরসিএ পরীক্ষা নিজেই একটি চূড়ান্ত যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যম। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই যেখানে সক্ষমতার মানদণ্ড, সেখানে অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে অগ্রাধিকার দিলে পরীক্ষার যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।”
নিয়োগকারী মহলের যুক্তি হলো—শিক্ষাদান একটি ব্যবহারিক পেশা, যেখানে অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সমালোচকদের পাল্টা যুক্তি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগেও অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়; বরং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই তুলনায় এনটিআরসিএ নিয়োগে প্রশিক্ষণকে অভিজ্ঞতার বিকল্প হিসেবে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি অভিজ্ঞতাকে অপরিহার্য বিবেচনা করা হয়, তবে তা নিয়োগ-পরবর্তী প্রশিক্ষণ, প্রবেশনাল পিরিয়ড বা কর্মকালীন মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে। নিয়োগের প্রাথমিক ধাপেই অভিজ্ঞতার অগ্রাধিকার আরোপ করলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগ কাঠামোর সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে মেধা যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিদ্যমান, সেখানে অভিজ্ঞতার শর্ত বা অগ্রাধিকার সাংবিধানিক সমতা, ন্যায়বিচার এবং তরুণ মেধার অংশগ্রহণ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। এনটিআরসিএর মতো একটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট ও নীতিগত ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।