আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে ভোটের মাঠে ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। একই পিতার দুই ছেলে, তবে দুই ভিন্ন মায়ের সন্তান, দুই বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছেন। একজন বিএনপির প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে, অন্যজন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ভোট চাইছেন।
২৮ নম্বর কুড়িগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনে আগামী নির্বাচনে ভোট দেবেন তিন উপজেলার মানুষ। চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬২ জন। এর মধ্যে চিলমারীতে ১ লাখ ১৪ হাজার ১০৫ জন, রৌমারীতে ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৮৮ জন এবং রাজিবপুরে ৭২ হাজার ৬৯ জন ভোটার রয়েছেন। এই আসনে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটের হিসাব কষছেন কর্মীরা, আর ভোটাররা ভাবছেন যোগ্য প্রার্থী ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে। চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত ইউনিয়ন থাকায় বরাবরের মতো এবারও ভোটের আগে এপাড়-ওপাড় নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। তার ওপর একই আসনে আপন দুই ভাই বড় দুই দলের প্রার্থী হওয়ায় চায়ের টেবিল থেকে হাটবাজার পর্যন্ত চলছে নানা আলোচনা। এমপি কি এবার একই ঘরে যাবেন, নাকি অন্য কেউ জয়ের মালা পরবেন—এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
এই দুই ভাইয়ের পিতা আলহাজ মনছুর আহাম্মদ পাকিস্তান আমলে ১৯৬২-৬৩ সালে মুসলিম লীগের এমপিএ এবং ১৯৬৫ সালে এমএনএ ছিলেন। বড় ছেলে মো. আজিজুর রহমান বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। তিনি ১৯৪৮ সালে রৌমারী উপজেলার যাদুরচরে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি। তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। তার মায়ের নাম আছিয়া খাতুন। আজিজুর রহমান ১৯৬৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে প্রথম নির্বাচন করেন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯১ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করলেও জয়ী হতে পারেননি। তবে তিনি যাদুরচর ইউনিয়ন থেকে তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। হলফনামা অনুযায়ী তার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ছোট ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৫৯ সালে একই উপজেলার যাদুরচরে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি। তার মায়ের নাম মোছা. হাজেরা বেগম। হলফনামা অনুযায়ী কৃষি থেকে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং ব্যবসা থেকে ১ লাখ টাকা। তিনি আগে কোনো নির্বাচনে অংশ না নিলেও দীর্ঘদিন ধরে জনসেবা ও উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন।
ভোটারদের মতামতেও রয়েছে ভিন্নতা। নয়ারহাটের ভোটার মোস্তফা বলেন, ভোট যোগ্য প্রার্থীকে দেব, তবে আপন দুই ভাই মাঠে থাকায় মনে হচ্ছে দলে কি আর যোগ্য লোক নেই। চিলমারী চরের নুর ইসলাম বলেন, এমপি হলে অনেকেই ভুলে যায়, তবে দুই ভাইয়ের লড়াই ভোটের আলোচনাকে বেশ জমিয়ে দিয়েছে। রাজিবপুরের ভোটার সলিমুদ্দিন মিয়া বলেন, আমরা শান্তি আর এলাকার উন্নয়ন চাই, কথা নয় কাজ দেখতে চাই।
প্রার্থীদের বক্তব্যেও রয়েছে আত্মবিশ্বাস। বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান বলেন, মানুষ বিএনপিকে চায়, ধানের শীষের জয় নিশ্চিত। আগেও জয় নিশ্চিত ছিল, ভোট চুরির কারণে হয়নি। এবার সুষ্ঠু ভোট হবে। জামায়াতের প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভোটাররা পরিবর্তন চায়, দাঁড়িপাল্লার জয় হবে ইনশাআল্লাহ।
সূত্র অনুযায়ী, সম্পদের দিক থেকেও দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান ও তার স্ত্রীর নগদ অর্থসহ মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও তার স্ত্রীর নগদ অর্থসহ সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, বরং আপন দুই ভাইয়ের ভিন্ন পথের লড়াই হিসেবে নজর কেড়েছে ভোটার ও সাধারণ মানুষের।