স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জেগে উঠেছে এক নতুন প্রত্যাশা। দীর্ঘ ৫৪ বছরের অপেক্ষার পর প্রথমবারের মতো এই উপজেলার একজন কন্যা জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান–এর মনোনয়নকে ঘিরে দেবীগঞ্জজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসুক আলোচনার আবহ।
সোমবার (২০ এপ্রিল) রাতে জোটগত সিদ্ধান্তে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান—সবখানেই উচ্চারিত হচ্ছে এক নতুন নাম।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে আসা পঞ্চগড়-২ আসন (দেবীগঞ্জ-বোদা) থেকে স্বাধীনতার পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কেউই দেবীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন না। আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)সহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হলেও তাদের অধিকাংশের নিবাস ছিল বোদা উপজেলায়। ফলে স্থানীয়দের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল বঞ্চনার নীরব অনুভব। অনেকেই মনে করছেন, তাসমিয়া প্রধানের মনোনয়ন সেই শূন্যতা পূরণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।
দেবীগঞ্জের জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা ওয়াসিস আলম বলেন, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল সংসদে নিজেদের একজনকে দেখতে পাওয়া। তার ভাষায়, “নিজ এলাকার প্রতিনিধি সংসদে গেলে আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার পথ সহজ হবে।”
অন্যদিকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সিরাতুল মোস্তাকিম মনে করেন, বড় দলগুলোর মনোনয়ন রাজনীতিতে দেবীগঞ্জ বরাবরই অবহেলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, এই মনোনয়ন অবশ্যই প্রাপ্তি; তবে এলাকার সঙ্গে প্রার্থীর নিয়মিত সংযোগ বজায় রাখা জরুরি, যাতে মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কোনো ঘাটতি না থাকে।
তাসমিয়া প্রধানের শিকড় প্রোথিত চিলাহাটি ইউনিয়নের এক রাজনৈতিক পরিবারে। তার পিতা শফিউল আলম প্রধান ছিলেন দেশের পরিচিত রাজনীতিক ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার দাদা গমির উদ্দিন প্রধান দায়িত্ব পালন করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ-এর শেষ স্পিকার হিসেবে।
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় তাসমিয়া প্রধান যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৮ সালে জাগপার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। একই বছরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-২ আসন থেকে অংশ নিয়ে তিনি ওই আসনের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন।
দেবীগঞ্জের মানুষের কাছে তার মনোনয়ন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বহুদিনের প্রত্যাশা, পরিচয় ও প্রতিনিধিত্বের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন।