জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ‘নিকটাত্মীয়ের পরিকল্পনায়’ নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে বুধবার জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল এই দাবি করেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- নিহত হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৩০), তার ছেলে শাহিন হোসেন ও হাবিবুরের আরেক বোনের ছেলে সবুজ রানা (২০)। তিনজনের বাড়ি উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে।
মঙ্গলবার উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রাম থেকে দুই শিশুসহ এক পরিবারের চারজনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।
তারা হলেন- ওই গ্রামের নমির হোসেনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী সুলতানা পপি (২৫), তাদের ছেলে পারভেজ (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া রহমান (৩)।
ঘটনার পর পরই হাবিবের ভাগনে সবুজ রানা, তার বাবা নমির উদ্দিন, দুই বোন ডালিমা বেগম ও হালিমা বেগমসহ ছয়-সাতজনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে।
শুরু থেকেই পুলিশ চার হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমিজমার বিরোধকে সামনে রেখে এগোচ্ছিল; তবে ঘরের দেয়ালে দলিল চেয়ে ‘খুনিদের’ লেখা একটি বার্তা সেই ধারণাকেই আরো উসকে দেয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘নমির তুই বেঁচে গেলি, দলিল দে। এবার তোর পালা।’
দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। হাবিবুরের বাবা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তার সম্পত্তি লিখে দেন। তিনি তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি তার মেয়েদের লিখে দেন। হাবিবুরকে বেশি সম্পত্তি লিখে দেওয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সঙ্গে হাবিবুরের ঝামেলা শুরু হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
পুলিশ সুপার দাবি করেন, “জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন ও হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। সোমবার বিকালে হাবিবুর তার ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে উপজেলার ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে যান। হাবিবুর এক লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন। পরে গরু না কিনেই বাড়িতে ফিরে আসেন।
“বাড়ি ফিরে আসার পর গ্রামের একটি মাঠে গিয়ে সবুজ রানা, শহিদুল, শাহিনসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয়জন পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার রাত ৮টার দিকে হাবিবুরের বাড়িতে যান সবুজ রানা। তিনি তার মামা-মামী ও মামাত ভাই-বোনদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খান। ওই সময় সবার অগোচরে হাবিবুরের ভাগনে শাহিন বাড়িতে প্রবেশ করে একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সবুজ রানা খাবার খেয়ে বের হয়ে যান।
“বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন মূল দরজা খুলে দেয়। তখন সবুজ রানা, শহিদুলসহ খুনিরা পাঁচজন বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে হাবিবের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দেয়। এরপর হাবিবের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করে। হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। হাবিবকে হত্যা করার সময় পপি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন। বাড়ির আঙিনায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পপির মাথায় হাসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়েন। পরে তাকেও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে হাবিবের পুরো পরিবারকে নির্বংশ করার উদ্দেশে তার দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।”
তারিকুল ইসলাম বলেন, “সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবের বাড়িতে আসেন। তখন তাদের কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, রাতে গ্রামের একটি খড়ের গাদায় লুকানো হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়া উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।”
পুলিশ সুপার বলেন, “খুনিরা মনে করেছে, হাবিবুরকে নির্বংশ করলে পরবর্তীতে হাবিবের নামে থাকা সম্পত্তির ভাগিদার তারা হবে। এই ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে।”
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) জেলার ওসি হাসিবুল্লাহ হাবিব, নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।