
ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক নামধারী কতিপয় বিকৃত মস্তিস্কের ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত যৌন অপরাধ, পুরুষ শিশু বলাৎকার এবং নারী-শিশু কিশোরীদের গোপন ও প্রকাশ্যে ধর্ষণের চিত্র, আজ যেন ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং নৈতিক স্খলনের নিত্য নৈমিত্তিক সামগ্রিক ঘটমান প্রমাণিত চিত্রের প্রতিকার যেন সময়ের মানচিত্রে অতিব জরুরী।
➤প্রেক্ষাপট্ ও বর্তমান পরিস্থিতি:- সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার স্ক্রিনে চোখ রাখলে একটি ভয়াবহ ও বীভৎস চিত্র প্রতিনিয়ত-ই ফুঁটে ওঠে। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোমলমতি শিশুদের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশু, যাদের জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা শিক্ষকদের হাতে তুলে দেন, তারাই আজ লালসার শিকার হচ্ছে। তথাকথিত ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে এক শ্রেণির কুলাঙ্গার শিক্ষক ও অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিরা যে জঘন্য অপরাধ করে চলেছে, তা কেবল আইনি অপরাধ নয়, বরং চরম মানবিক বিপর্যয়।
➤অপরাধের ধরন ও মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল:- প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই অপরাধগুলো সাধারণত নিম্নোক্ত উপায়ে সংঘটিত হচ্ছে:
** হিপনোটাইজ ও বশীভূতকরণ:- শিক্ষক মহান এবং গুরুজন, গুরুজনের আদেশ চিরচারিত এবং চিরোধার্য, এই নমনীয় ও গুরু ভক্তির মতবাদ সহ তথাকথিত তুকতাক, তাবিজ-কবজ কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের অপব্যাখ্যা দিয়ে শিশুদের মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে।
** গুরু ভক্তির অপব্যবহার:-‘উস্তাদের আদেশ শিরোধার্য’- এই নীতিকে ঢাল হিসেবে এবং নিজস্ব মতবাদে গড়া হাদিস কোরআনের বিকৃত তরজমা ব্যবহার করে শিশুদের মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
** ভয়ভীতি ও শারীরিক প্রহার:- অবাধ্য হলে বা ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখালে শিশুদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়, যা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী ট্রমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
➤দারিদ্র্য ও সুযোগসন্ধানী মানসিকতা:- অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানরাই এসব আবাসিক মাদ্রাসার মূল শিক্ষার্থী। এই দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ‘লজিং’ বা পরের বাড়িতে খাওয়ার অভ্যাস থেকে শুরু করে অন্যের সম্পদের ওপর লোভ লালসা জন্মায় এই এক শ্রেণির শিক্ষকদের মাঝে। পেটের ক্ষুধা আর কামের ক্ষুধা যখন একীভূত হয়, তখন এই কুলাঙ্গাররা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শিক্ষকতার মহান পেশা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এরা দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে চাকরি নেওয়া থেকে শুরু করে মাদ্রাসার ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ ও বিভিন্ন উন্নয়ন ফান্ডের অজুহাতে প্রতিনিয়তই টাকা উত্তোলন, এ যেন ভিক্ষাবৃত্তি পেশার উপরের পেশায় নিত্য নৈমন্তী ঘটনায় আজ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
➤আইনি ও সামাজিক বাস্তবতা:- পরিসংখ্যান বলছে, এই ধরনের যৌন নির্যাতনের ৯০% ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায়-‘সামাজিক লোকলজ্জা এবং প্রভাবশালীদের’ চাপের কারণে। মাত্র ১০% ঘটনা জনসমক্ষে আসে, যার বিচার প্রক্রিয়াও অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে। ১১ বছরের শিশুর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধের মাত্রা কতটা গভীর ও বিপদজনক। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক তদারকির বিশাল একটি শূন্যস্থান।
➤জরুরি সুপারিশমালা ও দাবি:- এই অরাজকতা বন্ধে এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার, মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি:
** কঠোর আইন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি:- এই সকল ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে প্রকাশ্য ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
** নারী মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক নিষিদ্ধকরণ:- মহিলা মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় পুরুষ শিক্ষকদের অবাধ যাতায়াত এবং আবাসন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। তদারকির দায়িত্ব নারী কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত করতে হবে।
** মানসিক ও নৈতিক পরীক্ষা:- শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল সনদ নয়, বরং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও চারিত্রিক সততা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।
** নিয়মিত তদারকি ও সিসিটিভি স্থাপন:- প্রতিটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীদের নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে।
** জনসচেতনতা বৃদ্ধি:- শিশুদের ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে তাদের সন্তান কোনো বিশেষ ‘গুরু ভক্তি’র নামে শোষিত না হয়।
সর্বপরি, সত্য বড় তিতা হলেও, ধর্মীয় শিক্ষা কিন্তু পবিত্র। কিন্তু সেই পবিত্রতার আড়ালে যারা বিকৃত কামলালসা এবং দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছে, তারা সমাজের শত্রু, ইসলামের শত্রু এবং মানবতার শত্রু। এখনই সময় এই কুলাঙ্গারদের সমাজ থেকে উপড়ে ফেলার। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের জাগ্রত বিবেকই পারে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে। নতুবা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অন্ধকার ও বিকলাঙ্গ মনস্তত্ত্ব নিয়ে বেড়ে উঠবে, যার দায়ভার কেউ এড়াতে পারবে না।