দীর্ঘদিন ধরে ICU এর দায়িত্বে থাকা একজন নার্স বলেছিলেন,’মৃত্যুর আগে কোন একজন রোগীও বলেনি যে তার আরও টাকা বা ক্ষমতা চাই। সবাই শুধু বলেছে, আমি যাদের কষ্ট দিয়েছি তারা যেন আমাকে ক্ষমা করে।’
মানুষ ধর্মে দ্বিমত করে, দর্শন নিয়ে তর্ক করে, বিজ্ঞানে সন্দেহ করে কিন্তু মৃত্যু নিয়ে কেউ কখনো দ্বিমত পোষন করেনা।
Modern neuroscience ও ICU এর পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে মৃত্যুর ঠিক আগে মস্তিষ্কে Gamma brain wave হঠাৎ বেড়ে যায়। এই ওয়েভ সাধারণত গভীর সচেতনতা, আত্মউপলব্ধি ও স্মৃতির সাথে যুক্ত। আর তাই অনেক মানুষ মৃত্যুর আগে বলে,’পুরো জীবন চোখের সামনে দেখতে পারছি, সময় ধীরে চলছে, শান্তি লাগছে।’
বিজ্ঞান এই অবস্থাকে বলে, Life Review Phenomenon এর মানে ব্রেইন নিজেই যেন জীবনের হিসাব নেয়।
Existential Psychology বলে, ‘মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় না, মানুষ ভয় পায় তার অসম্পূর্ণ জীবনকে।’
তাই মৃত্যুর আগে সবচেয়ে অহংকারী মানুষটাও নরম হয়ে যায়। বহু বছর কথা না বলা মানুষদের কথা মনে পড়ে। মনের ভেতর ছোট ছোট অপরাধের জন্যেও ক্ষমা চাইবার ইচ্ছে তৈরি হয়। এই অবস্থাকে বলে Ego Dissolution। এ সময়ে ‘আমিত্ব’ ভেঙে পড়ে। মানুষ যে অতি সাধারণ সেটা বুঝতে পারে।
পবিত্র কুরআন এ আছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সূরা আল ইমরান: ১৮৫)
ইসলামে মৃত্যু শেষ নয় বরং হিসাবের শুরু। নবী বলেছেন,’কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ।’
ইসলামে জান কবচকে বলা হয় ‘সাকারাতুল মওত’ এর মানে মৃত্যুর এমন মুহূর্ত, যখন রূহ শরীর থেকে বের হওয়ার সময় তীব্র বাস্তবতা অনুভূত হয়।
কুরআনে বলা হয়েছে,’মৃত্যুর যন্ত্রণা সত্যিই এসে পড়ে এবং এটাই সেই সত্য, যেখান থেকে তুমি পালাতে চেয়েছিলে।’ (সূরা কাফ: ১৯)
হাদিস ও ইসলামি ব্যাখ্যায় বলা হয় নেক মানুষের জন্য জান কবচ হয় সহজ ও শান্ত। রূহ বের হয় যেমন পাত্র থেকে পানি গড়িয়ে বেরিয়ে আসে তেমনি করে। আর গুনাহগার মানুষের জন্য জান কবচ হয় কষ্টকর ও ভয়ংকর। রূহ বের হয় যেমন শরীর, মাংস থেকে পশম টেনে আলাদা করা হয় তেমনি।
বাইবেলে বলা হয়েছে,’It is appointed for man to die once, and after that comes judgment.’ (Hebrews 9:27)
এর মানে মানুষ একবার মরবে তারপর তাকে বিচার সম্মুখীন হতে হবে। খ্রিস্টধর্মে মৃত্যু মানে,’ আত্মার ঈশ্বরের সামনে হাজিরা।’
ইহুদি ধর্মে বলা হয়,’This world is the corridor, the next world is the palace.’
এর মানে এই দুনিয়া শুধু একটি করিডর বা পথ, আসল গন্তব্য হলো পরের জগৎ। মৃত্যু হলো সেখানে প্রবেশের দরজা।
হিন্দুধর্মে কৃষ্ণ বলেন,’যেমন মানুষ পুরোনো কাপড় ছেড়ে নতুন কাপড় পরে, তেমনই আত্মা পুরোনো দেহ ছেড়ে নতুন দেহ গ্রহণ করে।’ (গীতা ২:২২)
হিন্দুধর্মে মৃত্যু মানে কর্মফলের ধারাবাহিকতা আর বুদ্ধ বলেছেন,’সবকিছু ক্ষণস্থায়ী। যা জন্মেছে, তা ধ্বংস হবেই।’
বৌদ্ধ দর্শনে মৃত্যু মানে আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার দরজা।
ধর্ম আলাদা, কিন্তু মৃত্যুর সামনে মানুষের ভাষা এক। ক্ষমতা, সম্পদ সব রেখে চলে যেতেই হবে! কীসের এতো অহংকার, টেনশন আর বুক ভর্তি ঘৃণা? ভালোবাসতে শিখুন। মন শান্ত হোক। মন শান্ত হলেই পৃথিবীতে কাটানো দিনগুলো কাটবে শান্তিতে।