মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এখন ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক, সংবেদনশীল ও আশঙ্কাজনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থানের পর গোটা অঞ্চলটি এক সর্বগ্রাসী পরমাণবিক বা আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বিভিন্ন পরাশক্তির পরমাণু শক্তি বহনকারী যুদ্ধবিমানের অভূতপূর্ব মহড়া এবং ইরানের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক পাল্টা আঘাতের মহা প্রস্তুতি বিশ্ববাসীকে এক অনিশ্চিত ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামান্য ভুল হিসাব-নিকাশ বা উসকানি যে কোনো মুহূর্তে পুরো বিশ্বকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পরমাণবিক মহড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সামরিক উত্তেজনার পারদ:- সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ও কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে নজিরবিহীন সামরিক তৎপরতা দেখা গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য পারমাণবিক বা উচ্চ-ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরাশক্তিগুলো কৌশলগত বিমান মহড়া চালিয়েছে। এটি কেবল সাধারণ সামরিক উপস্থিতির অংশ নয়, বরং যেকোনো আকস্মিক চরম আঘাত সামাল দেওয়া বা শত্রুকে শক্ত বার্তা দেওয়ার কৌশল। এর ফলে ইসরায়েল, ইরান এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে সার্বক্ষণিক যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে।
ইরানের ‘মহা প্রস্তুতি’ ও পাল্টা আঘাতের হুমকি:- ইসরায়েলের সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে তেহরান এবার পিছু হটতে নারাজ। ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর চূড়ান্ত বার্তা অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা সব ধরনের শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, ইরান তার আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং আত্মঘাতী ড্রোন ইউনিটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে। ইসরায়েল কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর একযোগে বহুমুখী ও বিধ্বংসী আঘাত হানার লক্ষ্যে তেহরান তাদের রণকৌশল চূড়ান্ত করেছে।
সংঘাত বিস্তৃত হলে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে যেসব দেশ ও শক্তি:- একটি পূর্ণাঙ্গ বা পরমাণবিক মাত্রার সংঘাত কেবল ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামরিক জোট ও কৌশলগত সমীকরণের কারণে একাধিক রাষ্ট্র ও গোষ্ঠী এতে সরাসরি অংশ নিতে পারে।
প্রত্যক্ষ রণক্ষেত্র (ইরান ও ইসরায়েল):- আক্রমণের প্রথম সারিতে থাকা ইসরায়েল এবং তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে প্রস্তুত ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রসমূহ:- ইসরায়েলের মূল সামরিক ও কূটনৈতিক অভিভাবক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম থাকার কারণে তারা সরাসরি ইরানের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর মিত্র দেশগুলো তাদের ঘাঁটি রক্ষায় সামরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।
ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance):- লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাক ও সিরিয়ার ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের ওপর বহুমুখী আক্রমণ চালিয়ে সংঘাতের বিস্তার ঘটাবে।
উপসাগরীয় ও প্রতিবেশী দেশসমূহ:- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মতো দেশে মার্কিন ঘাঁটি এবং কৌশলগত তেল অবকাঠামো রয়েছে। নিজেদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড সুরক্ষার প্রশ্নে অথবা ইরান-মার্কিন সরাসরি সংঘাতের জেরে এই দেশগুলোও বাধ্য হয়ে সংঘাতের মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:- এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক স্থায়ী রূপান্তর ঘটাতে পারে।
জ্বালানি বিপর্যয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা:- বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ বা লোহিত সাগর অবরুদ্ধ হলে অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে চরম মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হবে।
শক্তি ভারসাম্যের বদল ও নতুন অক্ষ গঠন:- যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়লে চীন ও রাশিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করবে। রাশিয়া-ইরান সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হতে পারে, যা পশ্চিমা আধিপত্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি (Nuclear Proliferation):- ইরানের পারমাণবিক অবস্থানে পরিবর্তন এলে তা মধ্যপ্রাচ্যে এক বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার সূচনা করবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব, তুরস্ক বা মিশরও নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করার দিকে ঝুঁকতে পারে।
নজিরবিহীন মানবিক ও সামাজিক সংকট:- বিস্তৃত সামরিক সংঘাতের ফলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে, যা আন্তর্জাতিক শরণার্থী ব্যবস্থা ও বিশ্বজুড়ে এক গভীর মানবিক সংকটের জন্ম দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের মেঘে আচ্ছন্ন। পারমাণবিক মহড়ার হুংকার এবং তেহরানের পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতা সচল রাখার জোর দাবি থাকলেও, মাঠের বাস্তবতা বলছে যুদ্ধ এড়ানোর সময় ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে।



