যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় আলোচিত রানা প্রতাপ হত্যা মামলায় তার এক বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে ওই নারীকে হেফাজতে নেয় মণিরামপুর থানা পুলিশ। তিনি স্থানীয় একটি বাজারে একটি বিউটি পার্লার পরিচালনা করতেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে নিহত রানা প্রতাপের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী বাদী হয়ে মণিরামপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশ হেফাজতে নেওয়া ওই নারীর সঙ্গে রানা প্রতাপের পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে কাটাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়। পরবর্তীতে ওই নারীর অন্যত্র বিয়ে হলেও, তার স্বামী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে বিয়ের পরও রানা প্রতাপের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রানা প্রতাপ নিয়মিত ওই নারীর বিউটি পার্লারে যাতায়াত করতেন। হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে তাকে কপালিয়া বাজারের বরফকলে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলটি ওই বিউটি পার্লারের সংলগ্ন একটি গলিতে অবস্থিত। এসব কারণে তদন্তে ওই নারীকে বিশেষ বিবেচনায় রেখেছে পুলিশ।
এদিকে, পুলিশ তদন্তে রানা প্রতাপের সঙ্গে স্থানীয় আরেকটি বরফকল মালিকের ব্যবসায়িক বিরোধের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নিহত রানা প্রতাপ কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের বাসিন্দা তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। তিনি একসময় মণিরামপুর, অভয়নগর ও খুলনার ফুলতলা এলাকায় চরমপন্থী দলের সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভয়নগর উপজেলা শ্রমজীবী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শ্রমিক নেতা মোল্যা ওলিয়ার রহমান হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন তিনি।
তবে প্রতিবেশীদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে রানা প্রতাপ এলাকায় ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্য ঘের, বরফকল ও নওয়াপাড়ায় একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পাশাপাশি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘বিডি খবর’ নামের একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবসরে গান করতেন বলেও জানান স্থানীয়রা।
রানা প্রতাপের পরিবার দাবি করেছে, তিনি ইংরেজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং মূলত ব্যবসায়েই মনোযোগী ছিলেন। তার ১০ বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। পরিবারের দাবি, আগের মামলাটি ছিল হয়রানিমূলক এবং তিনি সক্রিয় কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটে কপালিয়া বাজারে নিজ মালিকানাধীন বরফকলের সামনে অবস্থানকালে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন এবং মারা যান।
ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রজিউল্লাহ খান প্রথম আলোকে বলেন,
“তদন্তের স্বার্থে একজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিরোধসহ অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।”