যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান বড় ধরনের ধসে নতুন রেকর্ড গড়েছে। মঙ্গলবার (১২ মে) এক ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৫৮ রুপি, যা ভারতের ইতিহাসে সর্বনিম্ন মান।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনায় আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রুপির এই রেকর্ড পতন দেখল বাজার। এর আগের দিন সোমবার (১১ মে) প্রতি ডলার ৯৫ দশমিক ৩১ রুপি দরে বাজার বন্ধ হয়েছিল। মঙ্গলবার সেই রেকর্ড ভেঙে ভারতের মুদ্রা আরও নিচে নেমে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, আমদানিকারকদের বাড়তি ডলার চাহিদা এবং ভারতীয় বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কারণে রুপির ওপর এই তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।

রুপির এই দুর্বল অবস্থার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, গত এপ্রিলে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বর্তমানে ‘ম্যাসিভ লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। এই খবরের পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা এবং তেলের বাজারে নতুন সংকটের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়, সেখানে অস্থিরতা বাড়ায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। ভারত তার চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে বলে দেশটির বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধাক্কা লেগেছে।

এদিকে, গত সপ্তাহান্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনগণকে জ্বালানি ব্যবহার ও সোনা কেনা সীমিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্যকে বাজার বিশেষজ্ঞরা ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ও পরিশোধ ভারসাম্যের ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। সিআর ফরেক্স অ্যাডভাইজার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমিত পাবারি বলেন, তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থায় থাকলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

রুপির পতনের প্রভাব পড়েছে ভারতের শেয়ারবাজারেও। মঙ্গলবার সেনসেক্স ৭৪৮ দশমিক ২২ পয়েন্ট এবং নিফটি ২০৮ দশমিক ৭০ পয়েন্ট কমেছে। চলতি বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে ২ লাখ কোটি রুপির বেশি মূলধন তুলে নিয়েছেন। বিনিয়োগকারীরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির টানে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।

শুধু ভারত নয়, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মুদ্রাও বর্তমানে ডলারের বিপরীতে চাপে রয়েছে। তবে ভারতের জন্য ৯৬ রুপির স্তর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে রুপির মান শীঘ্রই ১০০ ছুঁয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।