গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কিন্তু সরকারি তথ্যে এই ভোগান্তির চিত্র উঠে আসছে না। বরং লোডশেডিং নিয়ে কারচুপি করছে বিদ্যুতের সংস্থাগুলো। চাহিদা কমিয়ে লোডশেডিং কম দেখানো হচ্ছে।
এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাপমাত্রা না কমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার তেমন কোনো আশা নেই। তবে আবহাওয়াবিদরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে মোট ছয় থেকে আটটি তাপপ্রবাহ হতে পারে এবং এর মাঝে তিন থেকে চারটি হতে পারে তীব্র তাপপ্রবাহ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কা রণে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিস সময় কমানো, শপিংমল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। কিন্তু লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে– সেসব ব্যবস্থা কতটা কাজে লাগছে। যদিও এ সংকট কাটাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। কয়লা সরবরাহ বাড়িয়ে এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ শেষে দ্রুতই পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার।
এদিকে বিগত সময়ের বকেয়া আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি তাদের পুরোনো পাওনা পরিশোধে তাগিদ দিয়ে পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এ ছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি কেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র ২টি।
এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বর্তমানে গড়ে চাহিদা ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদার বিপরীতে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট।
লোডশেডিংয়ে লুকোচুরি
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা, উৎপাদন, সরবরাহ চিত্র তুলে ধরে। সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে গত সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৯১২ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুসারে সোমবার রাত ৯টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট। কিন্তু বিতরণ কোম্পানির তথ্য বলেছে ভিন্ন কথা। দেশের সবচেয়ে বেশি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় সংস্থাটি চাহিদার চেয়ে ২ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পেয়েছিল। এর বাইরে আরও ৬টি বিতরণ সংস্থা রয়েছে। তবে ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি ডেসকো এবং ডিপিডিসিকে চাহিদা অনুসারে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়, যাতে লোডশেডিং কম হয়।
যদিও আরইবির তথ্য ওয়েবসাইটে থাকে না। বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য সংগ্রহ করেছে । আরও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আরইবির সোমবার দুপুর ১২টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৫১০ মেগাওয়াট, সেখানে পিজিসিবির তথ্যমতে, ঘাটতি ৯৮৯ মেগাওয়াট। বিকেল ৩টায় আরইবি বিদ্যুৎ কম পেয়েছে ২ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট। সেখানে পিজিসিবির মতে লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৪০২ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায় আরইবিকে ২ হাজার ৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। পিজিসিবির তথ্য বলছে, তখন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৩৯ মেগাওয়াট। রাত ৮টায় পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল ২৩ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। একই সময়ে পিজিসিবি ঘাটতি দেখিয়েছে ১ হাজার ২১০ মেগাওয়াট। রাত ৯টায় আরইবির মতে, লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ২৬৫ মেগাওয়াট। পিজিসিবি দেখিয়েছে ১ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। তবে আমরা আশা করছি, লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। তবে ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের তথ্যে গরমিল বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়াও গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়ছে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এবার যদি গরম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে যেতে পারে। তিনি বলেন, এটা অনেক দিন থেকে বলা হচ্ছে, পিডিবি বা অন্য সংস্থাগুলো বিদ্যুতের ঘাটতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।
পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ
লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। গতকাল থেকে সারাদেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় চরম বিঘ্ন ঘটছে।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ষোলটাকা গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান জানায়, তীব্র গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে পড়ালেখা করা খুব কষ্টকর হচ্ছে।
উদ্বিগ্ন কৃষক
যুদ্ধের কারণে বেশ কিছু দিন ধরেই কৃষক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। এরসঙ্গে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ফসলের উৎপাদন ঠিকমতো হওয়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা এখন তাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষকরা জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটের ফলে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। খুলনার কৃষকরা জানান, যখন পাম্প চালানো প্রয়োজন, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকছে না। এভাবে সেচকাজ ব্যাহত হতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত
ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটের ফলে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক কারখানার ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, ‘বিদ্যুতের লোডশেডিং আবার তেল-গ্যাসের সংকটে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন চালু রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না। সামনে ঈদ। কীভাবে যে ব্যয় সামাল দেব– তা নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকি।’
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পাম্প থেকে চাহিদামতো ডিজেল কিনতে পারছে না অনেক কারখানার মালিক। জ্বালানি তেলের অভাবে কারখানার নিজস্ব যানবাহনগুলো চলতে পারছে না। আবার ঠিকমতো বিদ্যুৎও থাকছে না। সব মিলে কঠিন সংকটে পড়েছে কারখানার মালিকরা। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়বে। পোশাক খাতের মতো টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্ট শিল্পও এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে।