ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান বলছে—অভ্যুত্থান কখনোই হঠাৎ ঘটে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সঙ্গে কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনার সংমিশ্রণেই বিস্ফোরণ ঘটে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিশ্লেষণে অভ্যুত্থানের পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
বহুল প্রচলিত গবেষণাপত্রের আলোকে দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরশাসন অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ। নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়া, বিরোধী মত দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচারহীনতা জনমনে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও সংবিধান ও আইনের অপব্যবহার রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থিডা স্ককপলের State and Social Revolutions গ্রন্থে এ ধরনের রাজনৈতিক সংকটকে অভ্যুত্থানের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য, আয়ের অসম বণ্টন এবং শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব অভ্যুত্থানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এর সঙ্গে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট এবং অসহনীয় করের বোঝা ক্ষোভকে আরও তীব্র করে। কার্ল মার্কস ও স্যামুয়েল হান্টিংটনের বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে রাজনৈতিক অস্থিরতার বড় উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে।
সামাজিক বৈষম্য ও প্রজন্মগত হতাশা
সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাব, জাতিগত, ধর্মীয় ও শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য অভ্যুত্থানের ঝুঁকি বাড়ায়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি অবহেলা এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা সমাজে গভীর হতাশা তৈরি করে। নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর কাঠামোগত নিপীড়নও এই ক্ষোভকে আরও জোরালো করে তোলে। টেড গারের Relative Deprivation Theory অনুযায়ী, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান যত বাড়ে, বিদ্রোহের সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পায়।
সম্মানবোধে আঘাত, জাতীয় পরিচয়ের সংকট এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ একপর্যায়ে বিস্ফোরিত হয়। শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আস্থাহীনতা অভ্যুত্থানকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেয়। জেমস সি. স্কট তাঁর Weapons of the Weak গ্রন্থে এই ‘নীরব ক্ষোভ’-এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
বিচারব্যবস্থার অকার্যকারিতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার এবং প্রশাসনের দলীয়করণ রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল করে। সংসদ ও স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা হারানোও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। পাশাপাশি বিদেশি হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ এবং পাশের দেশের অভ্যুত্থানের প্রভাব—যা ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ নামে পরিচিত—অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে পারে। আরব বসন্ত ও পূর্ব ইউরোপের অভিজ্ঞতা এর উদাহরণ।
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সংগঠিত হওয়া, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো এবং তথ্য গোপন বা গুজবের বিস্তার অভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দোষ হত্যাকাণ্ড, বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা অর্থনৈতিক ধাক্কা তাৎক্ষণিক প্ররোচক হিসেবে কাজ করে।
গবেষকদের মতে, অভ্যুত্থান সাধারণত কোনো একক কারণে ঘটে না। বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের সঙ্গে একটি তাৎক্ষণিক ট্রিগার যুক্ত হলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাষ্ট্র যখন মানুষের কথা শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই নীরব ক্ষোভই একসময় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।