রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলি—সবখানেই এখন বিচরণ তার। কখনও সিএনজি অটোরিকশার চালক, আবার কখনও মোটরসাইকেলে ‘পাঠাও’ রাইডারের বেশ। কিন্তু এই চালক বা রাইডার পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর মাদক কারবারি। তার নাম মানিক, অপরাধ জগতে যিনি ‘বরিশাইল্লা মানিক’ নামেই পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে রাইড শেয়ারিং সেবাকে সে ব্যবহার করছে ইয়াবা ‘হোম ডেলিভারি’র হাতিয়ার হিসেবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানিকের মাদক ব্যবসার মূল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত গুলশান, বনানী, মহাখালী, দক্ষিণখান ও নাখালপাড়া এলাকায়। নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার নাম করে সে আসলে ইয়াবার প্যাকেট পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট গ্রাহকের হাতে। সম্প্রতি মাদকের পথ ছেড়ে সুস্থ জীবনে ফিরে আসা এক যুবক মানিকের এই অভিনব কৌশলের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন।
কৌশলী কারবার ও মামলার পাহাড়:
মানিকের বিরুদ্ধে বাড্ডা ও বনানী থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। বারবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে সে পুনরায় পুরনো পেশায় লিপ্ত হয়। একজন ভুক্তভোগী জানান, মানিক মূলত দিনের বেশিরভাগ সময় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ চালু রাখে বা অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় থাকে যেন কেউ তাকে সন্দেহ না করে। তার ফোনের কললিস্টে থাকা সংকেত অনুযায়ী সে নির্দিষ্ট পয়েন্টে ইয়াবা সরবরাহ করে।
মাদক নির্মূল নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীরা এই প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। মাদক আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট রাইহানুল ইসলাম বলেন,
“পরিবহন খাতের আড়ালে মাদক ব্যবসা নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে রাইড শেয়ারিংয়ের মতো জনপ্রিয় সেবাগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাটা ভয়াবহ। এতে করে সাধারণ চালকরাও সন্দেহের তালিকায় চলে আসছেন। এই ধরনের ‘হোম ডেলিভারি’ বন্ধ করতে হলে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ কর্তৃপক্ষকেও চালকদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ে আরও কঠোর হতে হবে।”
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। সিএনজি বা পাঠাও রাইডারের বেশে ইয়াবা পাচারের তথ্য আমাদের কাছেও আসছে। বরিশাইল্লা মানিকসহ এ ধরনের চক্রের সদস্যদের ধরতে আমাদের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশপথ ও সন্দেহভাজন পয়েন্টগুলোতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে।”
যুবসমাজ ও সামাজিক ঝুঁকি:
ঘরে বসে অনায়াসেই মাদক হাতে পাওয়ায় ধ্বংসের পথে পা বাড়াচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ। বনানী ও দক্ষিণখান এলাকার সচেতন অভিভাবকরা জানান, এই ধরনের ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতাদের কারণে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং ও অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। মানিকের মতো মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।