বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে আজ হতাশা ও ক্ষোভ এক চরম বাস্তবতা। এর পেছনে মূল কারণ, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু সরকারি চাকরির জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের মেধার অপচয় হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বর্তমানে ৩২ বছর, যা অসংখ্য প্রতিভাবান যুবক-যুবতীর জন্য এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেশনজট, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অন্যান্য জটিলতার কারণে অনেক সময়ই এই মূল্যবান সময়টুকু তারা হারিয়ে ফেলেন। এই হতাশা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্রটি ও দুর্নীতি :
সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই প্রশ্ন উঠছে। প্রথাগতভাবে, শুধু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে (যেমন: গণিত, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান) দক্ষতা যাচাই করা হয়, যা একজন প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা মূল্যায়নে যথেষ্ট নয়। এর ফলে অনেক প্রার্থীর ব্যবহারিক জ্ঞান, বিশেষায়িত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। এছাড়াও, দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি এবং কোটা পদ্ধতির অপব্যবহারের অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড যোগ্য প্রার্থীদের হতাশ করে এবং তাদের কর্মজীবনের স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। জনগণের মধ্যে এমন ধারণা প্রবল যে, সরকারি চাকরি এখন মেধার চেয়েও প্রভাবশালী সংযোগের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতি শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
সমাধানের প্রস্তাব: নতুন আইন ও গণমন্ত্রণালয়
এই গুরুতর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে যদি ঘোষণা করা হয় যে, যেকোনো বয়সের যোগ্য ব্যক্তি সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারবে, তাহলে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। উন্নত বিশ্বে অনেক দেশেই চাকরির বাজারে বয়সসীমা তুলনামূলকভাবে কম কঠোর এবং যোগ্যতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি, দেশের জনগণের কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক মঙ্গলের জন্য একটি পৃথক গণমন্ত্রণালয় গঠন করা সময়ের দাবি। আমরা যদি জনগণের ভালোর কথা ভেবে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারি, তাহলে কেন গণমন্ত্রণালয় গঠন করে নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে পারব না?
* কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি: দেশের সব শিক্ষিত বেকারের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা, যা তাদের দক্ষতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
* বেকার ভাতা চালু: বেকারদের জন্য সাময়িক সময়ের জন্য বেকার ভাতা চালু করা যেতে পারে, যা তাদের হতাশা কিছুটা কমাবে এবং নতুন করে নিজেদের গড়ে তোলার সুযোগ দেবে।
* উদ্যোক্তা উন্নয়ন: তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করে স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
* স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া: নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা সম্ভব।
বৈষম্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকগণ যদি ৮৫ বছর বয়সেও দেশের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে পারেন, তবে যেকোনো বয়সের মানুষ কেন চাকরির সুযোগ পাবে না? বর্তমানে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সংখ্যক মানুষ কর্মের সুযোগ পেলেও, বেশিরভাগই বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করা এখন জনমনে প্রায়শই শোনা যায়।
আশার আলো ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
আমাদের দেশের অনেক মানুষ আছে যারা বয়সের কারণে কর্মহীন হয়ে হতাশার জালে আটকে পড়েছেন। তাই সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে যেকোনো বয়সের ব্যক্তিরা যাতে চাকরি করতে পারেন, সেই বিষয়ে দ্রুত আইন করা যেতে পারে। দেখা যায়, আমাদের মাঝে দিন দিন স্ট্রোকের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দুশ্চিন্তা এবং জীবনের প্রতি বাঁচার অনীহা। আমাদের উচিত এই শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর দিকে দৃষ্টি দিয়ে দ্রুত আইন করে পদক্ষেপ নেওয়া। তা না হলে তাদের জন্য বেকার ভাতার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। যদি বর্তমান সরকার গণঅধিকার বাস্তবায়ন করে, তবে সেটির বৃহত্তর লাভ হবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের। আসুন, সম্মিলিতভাবে আমরা আওয়াজ তুলি: “আর বেকার নয়, এবার হবো স্বাবলম্বী।” তবেই আসবে শান্তি আর মুক্তি।
দেশের যে সকল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ আছে, সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে আরও বেশি শিল্প ও কল-কারখানা স্থাপন করা হলে বেকারত্ব কমবে। দেশ আর পিছিয়ে থাকবে না, সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। জনগণের পক্ষ থেকে এই প্রত্যাশা করি।