উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার শেষ ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু গত ছয় মাস ধরে এই হাসপাতালের দুটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সই গ্যারেজে বন্দি হয়ে আছে। কারণ—গাড়ি আছে, তেল আছে, কিন্তু নেই কোনো চালক। ফলে মুমূর্ষু রোগী ও প্রসূতি মায়েদের জেলা শহরে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তি আর অতিরিক্ত অর্থব্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ছয় মাস আগে কর্মরত চালক মোঃ আব্দুল মজিদকে দিঘলিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। এরপর থেকে কয়রায় আর কোনো স্থায়ী চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে (আউটসোর্সিং) দিয়ে নামমাত্র জরুরি সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এটি প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
এদিকে, জাইকার অর্থায়নে পাওয়া অত্যাধুনিক অন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও চালক ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ১২১ কিলোমিটার দূরের জেলা শহরের হাসপাতালে যেতে যেখানে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ছিল একমাত্র ভরসা, সেখানে চালক না থাকায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স বা ভাড়া করা মাইক্রোবাসই এখন মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক কারণে কয়রা সদর থেকে দক্ষিণ বেদকাশীর মতো এলাকাগুলোর দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার পর্যন্ত। উপজেলা ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি রাসেল আহাম্মেদ বলেন:
”কয়রা একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। জেলা সদর এখান থেকে প্রায় ১১০-১২০ কিলোমিটার দূরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বা জরুরি প্রয়োজনে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে তিন-চারগুণ বেশি ভাড়ায় বেসরকারি গাড়ি নিতে বাধ্য হচ্ছে দরিদ্র রোগীরা। অনেক সময় পথেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বীকার করেছেন এই সংকটের কথা। তিনি বলেন, “একজন চালক দিয়ে কোনোমতে কাজ চালানোর চেষ্টা করছি। তবে স্থায়ী চালক নিয়োগ ছাড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।”
বিষয়টি নিয়ে খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের উপ-পরিচালক ডাঃ মোঃ মুজিবুর রহমান জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছু আইনি জটিলতার কারণে নতুন চালক নিয়োগে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কয়রার মতো দুর্গম এলাকার কথা বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত একজন চালক পদায়নের চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, অবিলম্বে দক্ষ চালক নিয়োগ দিয়ে গ্যারেজে পড়ে থাকা গাড়ি দুটি সচল করা হোক। জাইকার দেওয়া গাড়িটি যদি উপজেলা পরিষদের অধীনে এনে চালু করা যায়, তবে দক্ষিণ উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।