ভারতীয় রুপির দরপতন এখন আর শুধু মার্কিন ডলারের বিপরীতেই সীমাবদ্ধ নেই। গত এক বছরে পাকিস্তানি রুপি ও বাংলাদেশি টাকার বিপরীতেও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে ভারতীয় মুদ্রা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ তেলের দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়াকে এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ১ ভারতীয় রুপির মূল্য ছিল ৩.২৯১৩ পাকিস্তানি রুপি। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৯০১০ পাকিস্তানি রুপিতে। অর্থাৎ এক বছরে ভারতীয় রুপির দরপতন হয়েছে প্রায় ১১.৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালেই রুপির মান কমেছে প্রায় ৬.৮ শতাংশ।
এদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতেও রুপির অবমূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। বুধবার প্রতি ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির বিনিময় হার নেমে এসেছে ৯৬.৯৬-এ, যা দেশটির মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রুপির সাম্প্রতিক দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে দেশটির আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে ভারতের মতো অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে রুপির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
শুধু পাকিস্তানি রুপির বিপরীতেই নয়, বাংলাদেশি টাকার বিপরীতেও ভারতীয় রুপির দরপতন স্পষ্ট হয়েছে। গত এক বছরে প্রতি ভারতীয় রুপির বিনিময় হার প্রায় ১.৪২ বাংলাদেশি টাকা থেকে কমে প্রায় ১.২৮ টাকায় নেমে এসেছে। এতে বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে রুপির মান কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
রুপির অবমূল্যায়নের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এর ফলে বিদেশে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, আমদানি করা পণ্য এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মূলধন প্রবাহের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও গভীর হতে পারে।
সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রুপির দুর্বলতা বিদেশে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং ভ্রমণ ব্যয়কে প্রভাবিত করছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিদেশ ভ্রমণে কর বা সারচার্জ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই খবরকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে থাকলে স্বল্পমেয়াদে ভারতীয় রুপির অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী মাসগুলোতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের গতিপ্রকৃতি রুপির ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: ইকোনোমিস্ট টাইমস