1. admin@desh-bulletin.com : নিজস্ব প্রতিবেদক : দৈনিক প্রতিদিনের অপরাধ
  2. bot@local.invalid : Service Bot :
  3. infoobayed@gmail.com : infoobayed :
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কেন্দুয়ায় সাংবাদিক রুকন উদ্দিনের ৩ লাখ টাকার দুই ষাঁড়ের আকস্মিক মৃত্যু জামালপুরের ইসলামপুরে জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন সবচেয়ে বড় সাফল্য ৬ মাসে প্রতিটি সেক্টরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা: রিজভী সাতক্ষীরায় প্রতি ১০ জনে ৭ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার! ১০ জনের লাশ ফেলা হয় সাগরে, ২৯ বাংলাদেশি ভাসতে ভাসতে পৌঁছান মিসরে শেখ হাসিনা কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই: চিফ প্রসিকিউটর হাইকোর্টের নির্দেশনায়… সাঘাটায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জুনে রেকর্ড পতনের পর ফুজাইরায় বাঙ্কার জ্বালানি বিক্রি বেড়েছে চার বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের শঙ্কা সেপ্টেম্বরে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে মিলবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

সাতক্ষীরায় প্রতি ১০ জনে ৭ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার!

Desk report
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে যান। সাতক্ষীরা শহরের বাড়িতে একা হয়ে পড়ে মেয়েটি। পরিবারের কার্যকর নজরদারির অভাবে স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। কিন্তু স্বপ্নের সংসার অল্পদিনেই পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।

বিয়ের কয়েক মাস পর কিশোরী জানতে পারে, তার স্বামী নিয়মিত জুয়া খেলেন এবং বিভিন্ন ঋণের মধ্যে রয়েছেন। পাওনাদারদের চাপ, পারিবারিক কলহ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে একপর্যায়ে সংসার ছাড়তে বাধ্য হয় সে। ফিরে আসে বাবার বাড়িতে। চরম মানসিক চাপের মধ্যেও আবার পড়াশোনা শুরু করে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ-মাইনাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।

ওই কিশোরীর ভাষ্য, বৈবাহিক অশান্তি ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে না পড়লে তার ফলাফল আরও ভালো হতে পারত। এখন সে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। একই সঙ্গে ওই বাল্যবিবাহের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে।

ওই কিশোরী বলেন, “বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। শুরুতে মনে হয়েছিল সব ঠিক থাকবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সংসারে সমস্যা শুরু হয়। পরে জানতে পারি, আমার স্বামী নিয়মিত জুয়া খেলত এবং ঋণের মধ্যে ছিল। শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণে একপর্যায়ে আর থাকতে পারিনি। এখন আবার পড়াশোনা শুরু করেছি। আমার ইচ্ছা, পড়াশোনা শেষ করে নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলা।”

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাতক্ষীরাজুড়ে বাল্যবিবাহের কারণে শত শত কিশোরীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

লিখিত অঙ্গীকারের পরও বিয়ে: সাম্প্রতিক সময়ে শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামের কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রী এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বিয়ের ঘটনাও সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কিছুদিন আগে ওই কিশোর-কিশোরী একসঙ্গে বাড়ি থেকে চলে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্যদের মধ্যস্থতায় উভয় পরিবারকে নিয়ে সামাজিক বৈঠক হয়। সেখানে লিখিত অঙ্গীকার করা হয়েছিল—আইন অনুযায়ী বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিয়ে দেওয়া হবে না।

অভিযোগ রয়েছে, সেই অঙ্গীকার উপেক্ষা করে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলাম একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট করিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুজনকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। বর্তমানে তারা একই বাড়িতে অবস্থান করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। আদালত প্রাঙ্গণকে ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের মতো ঘটনা ঘটায় নোটারি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, “ঘটনাটি আমার কানে এসেছে এবং বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। তবে আমাদেরও কিছু আইনি ও দাপ্তরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।”

শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, “ঘটনাটি জানার পর আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত ছেলের বাবাকে কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য অফিসিয়াল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি উপস্থিত হলে আইনগত ও সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলামের দাবি, ছেলে-মেয়ে দুজনই নিজেদের ইচ্ছায় একসঙ্গে থাকতে চেয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বিয়ের সময় দুজনের বয়স আইনি সীমার নিচে থাকার বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার ৭২ শতাংশ: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৭২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলার মধ্যে শ্যামনগরসহ উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে বাল্যবিবাহের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি ও সামাজিক অসচেতনতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা সংকটও ভূমিকা রাখছে বলে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা মনে করছেন।

উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট ও লবণাক্ততা মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। জীবিকার প্রয়োজনে অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এমন একটি সামাজিক ধারণাও রয়েছে যে, নোনা পানির কারণে মেয়েদের শারীরিক সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং বয়স বাড়লে ভালো পাত্র পাওয়া কঠিন হবে। এই সামাজিক চাপ থেকেও অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রে গাবুরা: জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন। চারদিকে নদীঘেরা এই এলাকার স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বাল্যবিবাহের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস বলেন, “আমাদের ক্লিনিকে নিয়মিত যে গর্ভবতী নারীরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন, তাদের একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী। ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী গর্ভবতী মেয়েদের শারীরিক দুর্বলতা উদ্বেগজনক। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে তাদের নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।”

তার দাবি, গাবুরা থেকে মূল ভূখণ্ডে জরুরি যাতায়াতের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে প্রসবজনিত জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নোটারি এফিডেভিটে বাল্যবিবাহ বৈধ নয়: সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন বলেন, “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে মেয়ের এবং ২১ বছরের নিচে ছেলের বিয়ে সাধারণভাবে বাল্যবিবাহ হিসেবে বিবেচিত। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করিয়ে এমন বিয়েকে বৈধ করার সুযোগ নেই।”

তার ভাষ্য, আইনের বিশেষ বিধান নিয়ে অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া নোটারি পাবলিকের এফিডেভিটের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিয়ে বৈধ করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, “বয়স গোপন করে এফিডেভিট তৈরি বা বাল্যবিবাহে সহায়তা করার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নোটারি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি দরকার।”

‘৭২ শতাংশ শুধু একটি সংখ্যা নয়’:
দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত বলেন, **“৭২ শতাংশ বাল্যবিবাহ কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়-এটি মাঠের বাস্তবতার প্রতিফলন। বয়স না হলেও এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা আমরা নিয়মিত পাচ্ছি। সবাই জানে এটি বেআইনি, তারপরও বন্ধ হচ্ছে না। এর অর্থ কোথাও না কোথাও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।”

তার মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাই ছাড়া বিয়ের প্রক্রিয়া বন্ধ করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আগেভাগেই নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

প্রশাসনের দাবি, নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে: সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, “সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত কাজ করছি এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি গিয়ে বিয়েও বন্ধ করেছি। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, কিছু পরিবার গোপনে, রাতের বেলায় কিংবা অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করছে। কোথাও কোথাও এফিডেভিটের অপব্যবহার করে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, এসব কারণে প্রতিটি ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের নজরে আসে না। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে ঠেকাতে যেখানে পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পুলিশ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, সেখানে কোনো একটি স্তরে ব্যর্থতা ঘটলেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে একটি কিশোরীকে।

সাতক্ষীরার ওই ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়-এটি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিরোধ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© দেশ বুলেটিন 2023 All rights reserved
Theme Customized BY ITPolly.Com