একসময় ছিল একটি গোছানো সংসার। এখন সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা ফ্রিজ, চুরমার টেলিভিশন, উপড়ে ফেলা টিউবওয়েল, দুমড়েমুচড়ে যাওয়া আসবাবপত্র আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বসতঘর। মুহূর্তেই মাথার ওপরের ছাদ হারিয়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ১০টি পরিবার আজ নিঃস্ব। ঘরছাড়া এসব মানুষের চোখে এখন শুধু শূন্যতা, আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার আকুতি।
গত ৫ জুলাই দুপুরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নে জমি নিয়ে পূর্ববিরোধের জেরে সংঘবদ্ধ হামলার এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় ইউপি সদস্য খলিল মেম্বারের নেতৃত্বে কোরবান আলী ও সেকেন্দার আলীসহ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
ঘটনার দুই দিন পর ভুক্তভোগী বাহাদুর আলী বাদী হয়ে রাজারহাট থানায় ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ঘটনার কয়েকদিন পরও এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, তারা এখনও চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, “ওরা যখন রামদা-লাঠি নিয়া একসাথে আইলো, আমরা ভয়ে বাচ্চাগো নিয়া জীবনের মায়ায় দৌড় দিছি। আলমারি ভাঙি সব টাকা আর গহনা নিয়া গেছে। ঘরের আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করছে, টিন কুপাইছে। আমাদের এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই, আমরা এক্কেরে রাস্তায় পড়ি গেছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী আলতাফ হোসেন বলেন,“হামলার আগে খলিল মেম্বারের লোকজন মাইকিং করছিল, যাতে গ্রামের কেউ ওইদিকে না যায়। এরপর হঠাৎ করেই ইব্রাহিম আর বাহাদুরের বাড়িসহ লাইন ধরে ১০টি বাড়িতে ভাঙচুর শুরু করে। সবার হাতে ধারালো অস্ত্র থাকায় কেউ বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি।”
মামলার বাদী বাহাদুর আলীর অভিযোগ, হামলার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হইলো, পুলিশ চোখের সামনে খাড়ায় আছিল। আমরা ওনাদের কাছে সাহায্য চাইছি। কিন্তু পুলিশ শুধু দেখলো, হামলাকারীদের একটা বাধাও দিলো না। আমার ঘরের ফ্রিজ, টিভি সব ভাঙছে, ব্যবসার ২৬ লাখ টাকা লুট কইরা নিয়া গেছে। আমরা এখন কই যামু?”
প্রতিবেশী মোছা. শাহিদা বলেন, “পুলিশ থাকতে যদি এই অবস্থা হয়, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কার কাছে যামু? ঘটনার পর থেইকা ভয়ে আমরা রাতে ঘুমাইতে পারি না। হামলাকারীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরতাছে, মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি দিতাছে। আমরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে রাজারহাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নাজমুল আলম বলেন, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে সিভিল পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি নেই। তিনি জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দিনের আলোয় পুলিশের উপস্থিতিতে ১০টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় এখনও চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার ও ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ প্রতিকার পাবে।