মাদারীপুরের শিবচরের পাঁচ্চর এলাকায় রেলের কৃষিজমি নিয়ে বিরোধ যেন কাটছেই না। কৃষিকাজের জন্য লিজ নেওয়া জমিতে নির্মাণকাজ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লিজগ্রহীতাদের বিরোধ গড়িয়েছে হাইকোর্ট পর্যন্ত। আদালত রিট আবেদন খারিজ করার পরও ওই জমি নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ, ঢাকার আওতাধীন পাঁচ্চর এলাকার প্রায় ০.২৪ একর কৃষিজমি রাসেল মিয়া ও সেলিম রেজার নামে কৃষি লাইসেন্সে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। লাইসেন্সের নথি নম্বর ডিইও/ঢাকা/কৃষি নিলাম শিবচর/৯২৩৪। অভিযোগ রয়েছে, কৃষিকাজের জন্য বরাদ্দ নেওয়া ওই জমি পরবর্তীতে নির্মাণযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, কৃষি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট দুটি লাইসেন্স বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাসেল মিয়া ও সেলিম রেজা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, রিট পিটিশন নম্বর ১৬০১৩/২০২৫ ও ১৬০১৪/২০২৫ নিয়ে ৩০ জুন ২০২৬ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত আবেদনকারীদের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিতে যথেষ্ট ভিত্তি খুঁজে না পেয়ে আবেদনগুলো খারিজ করে দেন।
আদালতের আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, মামলার ৪ নম্বর বিবাদীর বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে সরাসরি স্বার্থ রয়েছে। তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পূর্ববর্তী মালিক ছিলেন—এমন বক্তব্যও আদালতের নথিতে এসেছে। এ কারণে তাকে মামলায় পক্ষভুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
রাস্তাও বন্ধ, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ের অধিগ্রহণকৃত জমির পাশ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী, স্কুলশিক্ষার্থী ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা চলাচল করতেন। কিন্তু জমি দখল ও নির্মাণকাজের কারণে সেই চলাচলের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কৃষিজমি লিজ নিয়ে তা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের প্রবণতা শুধু শিবচরেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজশাহীর পাকশীসহ রেলওয়ের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘দখল-বাণিজ্য’ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
পাঁচ্চর রেলওয়ে ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় রেলের জমি ঘিরে রাসেল মিয়া, সেলিম রেজাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।
অন্যদিকে, হাইকোর্টে রিট খারিজের পরও নিজেদের ‘বৈধ লিজগ্রহীতা’ দাবি করে সতর্কীকরণ ব্যানার টানানোর অভিযোগ উঠেছে। ওই ব্যানারে হাইকোর্টের চলমান রিটের নম্বর উল্লেখ করে নিজেদের লিজ বৈধ বলে দাবি করা হয়েছে।
আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, রিট খারিজের বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি আদালতের আদেশের অপব্যাখ্যা করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
তবে আদালত অবমাননার মতো গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও প্রত্যয়ন ছাড়া চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়। একইভাবে রেলভূমি দখল বা অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চান স্থানীয়রা
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হাইকোর্টের আদেশ ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। একই সঙ্গে রেলের জমিতে কোনো অবৈধ নির্মাণ হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রেলওয়ের জমি কৃষিকাজের জন্য লিজ নিয়ে সেটি নির্মাণ বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। পাশাপাশি রেলওয়ের বিপুল সম্পত্তি লিজ দেওয়ার পর তা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়মিত তদারকির আওতায় আনার দাবিও উঠেছে।