সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা লড়তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রায় সাড়ে তিনশো আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে অনেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছিলেন জামায়াতপন্থি আইনজীবীও। বর্তমান সরকারের সময়েও তাদের অধিকাংশই বহাল থাকায় এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দুই শতাধিক আইন কর্মকর্তা বিএনপির সক্রিয় অনুসারী। সম্প্রতি জামায়াতপন্থি সাতজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) একযোগে পদত্যাগ করেন। তবে বর্তমান সরকারের আমলে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের অনেককে নিয়োগ না করা এবং আগে নিয়োগ পাওয়া আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থি অনেকে এখনো অ্যাটর্নি জেনারেল কাযালয়ে কর্মরত থাকার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বাছবিচারহীনভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এমন কিছু ব্যক্তিও নিয়োগ পেয়েছেন, যারা আইন পেশায় নিয়মিত না, যাদের কোনোদিন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি। যাদের অনেকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট বারের পার্থক্য বোঝেন না। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাদের নিয়োগ করা হয়েছে। তারা মূলত সংখ্যা ভারী করছেন।
সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জাগো নিউজকে বলেন, সাধারণত আইন কর্মকর্তা পদে সরকার সমর্থক ও আস্থাভাজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়। এখানে সরকারকে বোঝার ব্যাপার থাকে। সরকার কী বলতে চায়, কী করতে চায়, তা-ও বুঝতে হয়। কারণ, এখান থেকে তথ্যপাচারেরও ঝুঁকি থাকে, যা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য ব্যাপক ক্ষতির সুযোগ ও আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় ও ইউনিটের বিভিন্ন সদস্যরা বলছেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসর রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের নিয়োগ হলো কীভাবে? মনে হয় সর্ষের মধ্যে ভূত রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এর দায় এড়াতে পারে না। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে অবিলম্বে এই কর্মকর্তাদের অপসারণ করতে হবে, অন্যথায় তারা কঠোর আন্দোলনে নামবেন।
তাদের ভাষ্য, বিএনপিপন্থি যেসব আইনজীবী বিগত ১৭ বছর বিরোধীদলে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, দল ক্ষমতায় আসার পর স্বাভাবিকভাবেই তারা নিয়োগ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের সেই স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরকার দ্রুত এর সুরাহা করবে বলে বিশ্বাস তাদের।
‘দ্য বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার ১৯৭২’ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ অন্য আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ আইনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইন কর্মকর্তা নিয়োগেরও বিধান রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগো নিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে দলীয় বিবেচনায় তারা (বর্তমানে কর্মরত অনেকে) নিয়োগ পেয়েছেন। নিশ্চয় তারা আওয়ামী লীগের লোক। অনেক আওয়ামী লীগের আইনজীবী এখনো অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আছেন। তাদের দিয়ে স্পর্শকাতর মামলাগুলো পরিচালনা করানো হচ্ছে। অথচ বিএনপির আইনজীবীদের শক্তিশালী অবস্থান থাকার পরও অতীতে নিয়োগপ্রাপ্তদের এখনো ডিএজি (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল) এবং এএজি (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) পদে বহাল রাখা হয়েছে।
তারা বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আইন অঙ্গনে আন্দোলন-সংগ্রাম করে তাদের অনেককে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে। অনেকেই মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে অন্যায়-জুলুমের শিকার হয়েও তারা এখন যথাযথ পদ পাচ্ছেন না। অথচ বিএনপিপন্থি আইনজীবীর বাইরে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থি অনেক আইনজীবী।
নিয়োগ নিয়ে যারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আমরা তাদের বলবো এখানে ক্ষোভ প্রকাশের কিছু নেই। সরকার শুধু এই একটি বিষয় নিয়ে বসে নেই। প্রায় ২০ বছর পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখানে মাল্টিপল কাজ রয়েছে সরকারের। যার মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ একটি। আশা করছি খুব শিগগির নিয়োগগুলো হয়ে যাবে।—ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অফিস-আদালতের মতো সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টেও একটা বড় পরিবর্তন আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিষয়টি অবগত, আইনমন্ত্রীকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন এখনো হচ্ছে না।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে দলীয় ফোরামসহ বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যক্তির কাছ থেকে তালিকা নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে। একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতও করা হয়েছে। আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, কয়েক মাস ধরে সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার এলেই বলা হচ্ছে, আজকেই প্রজ্ঞাপন জারি করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সরকারি আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ ইউ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপক্ষের একজন অন্যতম প্রতিনিধি। তাকে অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষে কোর্টে রাষ্ট্রের হয়ে রাষ্ট্রজড়িত সব মামলা দেখাশোনা করতে হয়, কোর্টকে সহায়তা করতে হয়। আইন কর্মকর্তারা মূলত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেন। মামলা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচারে ভূমিকা রাখেন। মামলার চাপ, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হতে পারে।
তিনি বলেন, আইন অঙ্গনে বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এখনো ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বাদ দিলে আইন কর্মকর্তাদের সংখ্যা এমনিতেই অনেক কমে যাবে। তখন সেখানে অন্যদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিপুল সংখ্যক আওয়ামীপন্থি আইনজীবী নিয়োগ পেয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলেও আইন কর্মকর্তা পদে তারা বহাল রয়েছেন। ফলে সেখানে এখনো আওয়ামী লীগের দোসর রয়ে গেছে। এই কর্মকর্তারা কি বর্তমান সরকারকে ওউন করেন?
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিনিয়র আইনজীবী জামিল আখতার এলাহী। বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ে ফ্যাসিবাদের ভূত রয়েছে, তাদের মাধ্যমে এসব নিয়োগ হয়েছে। আইন কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট।
আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সজল জাগো নিউজকে বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এ পর্যন্ত যত নিয়োগ হয়েছে, তার বেশিরভাগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। বিএনপি সরকারের সময়ে শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ হয়েছে। আর যারা পদত্যাগ করেছেন তারা বর্তমান বিরোধী দলের (জামায়াতের) সমর্থক। তারা নৈতিকভাবে বুঝতে পেরেছেন যে তাদের থাকা ঠিক না। যদিও তাদের আরও আগে পদত্যাগ করা উচিত ছিল। এক্ষেত্রে তারা চার মাস সময় ক্ষেপণ করেছেন।
তিনি বলেন, আমি মনে করি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেওয়া এসব নিয়োগ বিএনপি সরকারের ওপর বর্তায় না। যারা অন্য আদর্শ বা দলের বিশ্বাস ধারণ করেন তাদের তো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত। তারা যদি পদত্যাগ না করেন তাহলে নিয়োগের সময় বাদ দিলে তাদের জন্য একটা বিব্রতকর অবস্থা হবে। আমি চাই, যারা অন্য দল বা আদর্শ ধারণ করেন তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করুক।
‘স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি যেহেতু ক্ষমতায়, দলের সমর্থক আইনজীবীরা নিয়োগ না পেলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকতেই পারে। আশা করবো যোগ্য ও দক্ষদের মূল্যায়ন হবে’—যোগ করেন এ আইনজীবী নেতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিটেনশন অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান খান জাগো নিউজকে বলেন, সরকারের পলিসি মেকারের স্থানে এখনো বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, এফবিসিসিআই, বিসিবি, বিজেএমইএ, বিকেএমইএ, বিডা ও বেপজায় বিগত সরকারের নিয়োগ করা আইন কর্মকর্তারা রয়ে গেছেন। এমনকি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বন্দর, রাজউক ও বাংলাদেশে ব্যাংকেও আগের সময়ের আইনজীবীরা রয়েছেন। কিন্তু পরিসর বিবেচনায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বা সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের কাজের জায়গাটা ছোট।
তিনি বলেন, সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের একজন আইন কর্মকর্তা দলীয় মতাদর্শের না হলে সরকারের ইন্টারনাল যে পলিসি, সেটি কিন্তু অলরেডি তিনি জেনে যাচ্ছেন। সেখানে উনি সরকারকে কতটুকু সাপোর্ট দেবেন বা কতটুকু সহযোগিতা করবেন সেটি একটি প্রশ্ন। যে ব্যক্তি সরকারের আদর্শ ধারণ করেন না তিনি সরকারের পক্ষে কতটা ভূমিকা রাখবেন বলা ডিফিকাল্ট।
‘সরকারের কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা একটি মন্ত্রণালয়—এরকম জায়গাগুলো থেকে তো পলিসি নির্ধারণ হয়। সেসব জায়গায় তো এখন পর্যন্ত আইন কর্মকর্তা হিসেবে বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা রয়ে গেছেন। তারা যে শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আছেন তা তো না, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরেও গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে তারা দায়িত্ব পালন করছেন।’
আইন অঙ্গনে বিশেষ করে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এখনো ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি। ফ্যাসিবাদের দোসরদের বাদ দিলে আইন কর্মকর্তাদের সংখ্যা এমনিতেই অনেক কমে যাবে। তখন সেখানে অন্যদের নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।—শরীফ ইউ আহমেদ
মাহবুবুর রহমান খানের ভাষ্য, জামায়াতের যারা আছেন তাদের একটি অংশ এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন, যারা মনে করেছিলেন তাদের সরানো হতে পারে। কিন্তু তাদেরই আরেকটি অংশ কিন্তু ভেতরে ঠিকই রয়ে গেছে। তারা কিন্তু বলেন নাই যে আমাদের সবাই পদত্যাগ করেছি। আমরা হয়তো জানিও না যে অফিসিয়ালি তারা জামায়াত করে কি করে না। যারা পদত্যাগ করেছেন, পদত্যাগের পর জানলাম উনারা জামায়াতপন্থি। কারণ, সবাই তো ঢুকছেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।
তিনি বলেন, এখনো জামায়াতপন্থি যে কর্মকর্তারা আছেন সত্যিকার অর্থেই তারা যদি নীতিগতভাবে মনে করেন, জুলাই সনদ ও বর্তমান সরকারের যে আদর্শ বা নীতি তার সঙ্গে তারা একমত পোষণ করছেন না, তাহলে তাদের উচিত সরে যাওয়া। আওয়ামী লীগপন্থি যেসব আইনজীবী নিয়োগ পেয়েছেন, তারা যাদের মাধ্যমেই নিয়োগ পান, তারা হয়তো এখনো আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার চিন্তাভাবনা করবেন।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে যারা সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তাদের অনেকেরই আশা ছিল নিজেদের সরকার এলে আদর্শ ও পলিসি অনুযায়ী কাজ করতে পারবেন। কিন্তু সেটা এখনো দেখা যাচ্ছে না। এটি এমন না যে আর্থিক সুবিধার বিষয় আছে, এটি স্বীকৃতির বিষয়। ফলে বর্তমান সরকারের সমর্থক হিসেবে যেসব আইনজীবী নিয়োগ পাচ্ছেন না তাদের তো ক্ষোভ থাকতেই পারে।
জানতে চাইলে জামায়াতপন্থি সিনিয়র আইনজীবী মো. সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলাম। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন বিষয়ে আমরা কাছাকাছি অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু সরকার সেসব বিষয় থেকে সরে গেছে। নীতিগতভাবে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই বিষয়গুলোতে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা কাম্য ছিল। সরকার যেহেতু নেগেটিভ অবস্থান নিয়েছে, তাই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া অনেককে নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধে নিয়মিত কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান থেকে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াত শুধু মৌখিক প্রতিবাদ নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে থাকা বিভিন্ন পদ থেকে সরে এসে তারা সেই প্রতিবাদকে এস্টাব্লিশড করেছে। শুধু ডিএজি বা এএজি থেকে নয়, সারাদেশে যারা পিপি এবং এপিপি রয়েছেন তারাও সরে আসবেন। জামায়েতের সুপারিশে যারা এসব পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন তারা কেউ এখন এই কার্যালয়ে নেই বলেও দাবি করেন এ আইনজীবী।
নতুন সরকার গঠনের পরও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই সরকার পরিবর্তন হলে, নতুন সরকারের সমর্থক আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আর আগের সরকারের আইনজীবী যারা থাকেন তারা নিজেরাই নিজের তরফ থেকে পদত্যাগ করে চলে যান।
‘তবে সবশেষ সরকার যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন ছিল, ফলে তখন বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বিভিন্ন রকম তদবির করে ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের বেশিরভাগ এখনো কর্মরত’—যোগ করেন তিনি।
আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলাম। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন বিষয়ে আমরা কাছাকাছি অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু সরকার সেসব বিষয় থেকে সরে গেছে। নীতিগতভাবে সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই বিষয়গুলোতে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা কাম্য ছিল।—মো. সাইফুর রহমান
আইনজীবী নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার প্রাধান্য বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক এই সম্পাদক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা হচ্ছে, শুধু দলীয় আইনজীবী হলেই হবে না, মেধাবীও হতে হবে। রাষ্ট্রের যেন স্বার্থরক্ষা হয় সেটিও দেখতে হবে। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি খুব শিগগির নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হবে। আগে যারা ভিন্ন ভিন্ন দল থেকে এসেছেন, তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন নাকি রিমুভ হবেন, এগুলো পর্যবেক্ষণের পর আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, নিয়োগ নিয়ে যারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আমরা তাদের বলবো এখানে ক্ষোভ প্রকাশের কিছু নেই। সরকার শুধু এই একটি বিষয় নিয়ে বসে নেই। প্রায় ২০ বছর পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখানে মাল্টিপল কাজ রয়েছে সরকারের। যার মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ একটি। আশা করছি খুব শিগগির নিয়োগগুলো হয়ে যাবে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামানকে (বর্তমান আইনমন্ত্রী) অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। এর একদিন আগে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ আমলে নিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এএম) আমিন উদ্দিন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই সময় পর্যন্ত ২১৫ জন আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত পদত্যাগ করেন ৬৭ জন।
এরপর ১৩ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঁঞা, মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও মোহাম্মদ অনীক রুশদ হককে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগের পাশাপাশি ৯ জন আইনজীবীকে ডিএজি হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর আইন কর্মকর্তার নিয়োগ আসে ২৮ আগস্ট। ওইদিন সুপ্রিম কোর্টের ৬৬ জন আইনজীবীকে ডিএজি ও ১৬১ আইনজীবীকে এএজি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিযুক্ত সব আইন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ আরও ৩৪ আইনজীবীকে এএজি পদে নিয়োগ করে অন্তর্বর্তী সরকার। চতুর্থ দফায় ওই বছরের ৪ নভেম্বর ৪১ জন ডিএজির পাশাপাশি ৬৭ জন এএজি নিয়োগ পান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর আগের সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের বাদ দিলেও, এর পরবর্তী সময়ে সবগুলো নিয়োগেই সুযোগ বুঝে আওয়ামীপন্থি কিছু কিছু আইনজীবীকে আইন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে ৩০৫ জনের মতো আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত।